Responsive Ads for Rent
Showing posts with label ইনকিলাব. Show all posts
Showing posts with label ইনকিলাব. Show all posts

Saturday, 12 October 2019

প্লাস্টিকের সর্বব্যাপী আগ্রাসন রুখতে উদ্যোগ নিতে হবে।

আফতাব চৌধুরী | প্রকাশের সময় : ৬ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০২ এএম


রান্নঘরের তেলের বোতল, পানির বোতল, মগ, বালতি, বিস্কুটের প্যাকেট, চায়ের প্যাকেট, মশলার প্যাকেট থেকে শুরু করে চেয়ার টেবিল, টুল, টেবিল, ঢাকনা, তালা, গ্লাস, বাটি, চামচ, টিফিন বক্স, ঘরের দরজা-জানালা, ইলিকট্রিক পাখা, ছাতারবাট, গায়ের বর্ষাতি, পায়ের চপ্পল, জুতো গাড়িতে বসার সিটের স্পঞ্জ, ফোম, ঢাকনা, কোথায় নেই প্লাস্টিক। আছে চশমার ফ্রেমে, কলমের শরীরে, কম্পিউটারে , ল্যাপটপে, শার্ট-পেন্টের বোতামে, চেনে, কোমরের বেল্টে, ঘড়ির বেল্টে, চিরুনিতে, হাতের স্টিকে, ঔষুধের প্যাকেটে, ঔষুধের বোতলে, ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জে, ছোট বড় পানির পাইপে।
বাংলাদেশ তো বটেই, বিশ্বময় ছড়িয়ে আছে প্লাস্টিক সামগ্রী বিভিন্ন আকৃতিতে, বিভিন্ন প্রকৃতিতে। প্রতি বছর ত্রিশ কোটি মেট্রিক টনেরও বেশি প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরী হচ্ছে পৃথিবীতে। এক হিসেবে দেখো গেছে, গত এক দশকে বিশ্বে যত প্লাস্টিক দ্রব্য তৈরি হয়েছে, তার আগের একশো বছরেও তা হয়নি।
প্লাস্টিক পণ্য ওজনে হালকা, বহনে সহজ, প্রয়োজনে সহজেই যত্রতত্র নিয়ে ব্যবহার করা যায়, দামেও সস্তা। পলিথিনের একটি ছোট্ট প্যাকেট ভাঁজ করে বুক পকেটে পুরে সাহেব সেজে বাজারে গিয়ে দুই-তিন কেজি ওজনের শাক-সবজি বা মালপত্র নিয়ে সহজেই বাড়ি ফেরা যায়। এইভাবে হাজার রকমের সুবিধা রয়েছে প্লাস্টিক সামগ্রী ব্যবহারে। তাই এই যুগকে প্লাস্টি যুগ বললে নিশ্চয়ই বেশি বলা হবে না। অবশ্য ইতিহাসের লৌহ যুগ বা তা¤্রযুগের মত প্লাস্টিক যুগ কিন্তু মানবসভ্যতার অগ্রগতির নিশান উড়িয়ে যাচ্ছে না মোটেই বরং বিপরীত কাজটি করে যাচ্ছে অহরহ।
প্লাস্টিক শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘প্লাস্টিকস’, থেকে। প্লাস্টিকস-এর অর্থ ছাঁচে ফেলা বস্তু। সহজ করে বলা যায়, ছাঁচে ফেলে ইচ্ছামতো আকৃতি দিয়ে বানানো বস্তু। আরও সহজ করে হয়তো বলা যাবে যে, বস্তুকে ছাঁচে ফেলে ইচ্ছামতো আকৃতি দিয়ে পছন্দের দ্রব্যটি বানিয়ে নেওয়া। উপরে উল্লেখিত দ্রব্যসামগ্রীর প্রতি একটু মনোযোগ দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেব।
রাসায়নিক বিচারে প্লাস্টিক একটি পলিমার। পলি শব্দের অর্থ বহু, মার শব্দের অর্থ একক। অর্থাৎ কোনো বস্তুর একককে রাসায়নিকভাবে বহু সংখ্যায় যুক্ত করে নিজে তাকে বড় আকার দেওয়া। আবার একটি মাত্র বস্তুর একক ব্যবহার করে কিন্তু প্লাস্টিকের যাবতীয় দ্রব্য তৈরি হচ্ছে না। অনেকগুলো বস্তুর একক ভিন্ন ভিন্ন দ্রব্যের প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এইসব বস্তুর মধ্যে আছে ইথলিন, প্রোপাইলিন, বিউটেন, স্টাইরিন ইত্যাদি। কী বস্তুটি বানানো হবে, সেই বিচারেই ববহৃত বস্তু নির্বাচন করা হয়। আবার বস্তুটির সাথে মনমতো রং মিশিয়ে বানানো বস্তুটির রং দেওয়া হয়।
প্লাস্টিক মূলত খনিজ তেল, অর্থাৎ পেট্রোলিয়াম থেকে প্রস্তুত করা একটি বস্তু। যাঁদের বয়স পঞ্চাশ-ষাট বছর বা তার থেকে বেশি, তাঁরা নিশ্চয়ই মনে করতে পারবেন, তাঁদের ছোটবেলায় প্লাস্টিক সামগ্রীর এমন ছড়াছড়ি ছিল না কোথাও। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর মাটির নিচে প্রকান্ড সব খনিজ তেলের ভান্ডার আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকেই প্লাস্টিকের তৈরি সামগ্রী বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।
খনিজ গ্যাস থেকেও প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুত করা হয়। আবার একশো বছর আগেও প্লাস্টিকের দ্রব্য প্রস্তুত করা হত। কিন্তু তার পরিমাণ ছিল নিতান্তই স্বল্প। সেই পরিমাণ ধর্তব্যের মধ্যে ছিল না। কিন্তু এখন গোটা চেহারাটাই পালটে গেছে। একটি হিসাবে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত এক হাজার কোটি মেট্রিক টনেরও বেশি প্লাস্টিক দ্রব্য রয়েছে পৃথিবীতে। ব্যবহারের পরে এসব সামগ্রীর প্রায় সাড়ে ছ’শো কোটি মেট্রিক টন বর্জ্য হিসাবে ছড়িয়ে আাছে কৃষিক্ষেত্রে, রাস্তার পাশে, নালা-নর্দমায়, খাল-বিলে,নদ-নদীতে,সাগরে-মহাসাগরে। এমনকি, হিমালয় পর্বতের সর্বোচ্চ চূড়া এভারেস্ট শৃঙ্গেও। প্লাস্টিক কিন্তু পচে না বা সহজে নষ্ট হয় না। শত শত বছর, এমনকি হাজার বছরেরও বেশি সময় অবিকৃত থেকে যায়। আবার প্লাস্টিক পোড়ালে প্লাস্টিক থেকে বিষাক্ত কিছু গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে । এইসব গ্যাসের মধ্যে আছে ডাই-অক্সিন, হাইড্রোজেন ক্লোরাইড ইত্যাদি। এইসব গ্যাস ক্যানসার রোগ সৃষ্টিতে বা এই রোগের বৃদ্ধিতে সহায়কের কাজ করে। আবার যেসব দ্রব্যের একক থেকে বিভিন্ন প্রকারের প্লাস্টিক দ্রব্য তৈরি হয়, সেইসব দ্রব্যও ক্যানসার রোগ সৃষ্টিতে বা ওই রোগ বৃদ্ধিতে সহায়কের কাজ করে। তাই প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি কোন আধারে খাবার বস্তু রাখা একেবারেই ঠিক নয়।
যেসব প্লাস্টিক দ্রব্য জলে, স্থলে বর্জ্য হিসাবে ছড়িয়ে আছে, সেইসব বর্জ্য থেকেও বিষাক্ত উপাদান ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। অথচ বিশ্বে এখন কোটি কোটি মেট্রিক টন প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। ব্যবহারের পর তার বৃহৎ অংশই ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের সর্বত্র। অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন যে হারে প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রের পানিতে ফেলা হচ্ছে, এই হার বজায় থাকলে আগামী পঁচিশ তিরিশ বছরে তার সংখ্যা সমুদ্রের জলজ প্রাণীর সংখ্যা থেকে বেশি হয়ে যাবে।স্থলভাগেও প্লাস্টিক বর্জ্যরে পরিমাণ দিন দিন বৃৃদ্ধি পাচ্ছে। কি ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি করে যাচ্ছি আমরা, বুদ্ধিমান মানুষেরা।
গঠনগতভাবে প্লাস্টিক পচে না বা নষ্ট হয়ে যায় না। কিন্তু দীর্ঘদিন রৌদ্র বা বৃষ্টিতে থাকলে, বিশেষ করে সূর্যদেহ থেকে আসা অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে প্লাস্টিক কিন্তু ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এইসব টুকরো ছোট থেকে বড় সব মাপেরই হয়। যেসব টুকরো আকারে পাঁচ মিলিমিটার থেকে ছোট,সেইসব টুকরোকে মাইক্রো প্লাস্টিক বলা হয়। মাইক্রো প্লাস্টিকের একটি ভাগ আকারে এতই ছোট যে, খালি চোখে তাদের দেখাই যায় না। এইসব অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিকের টুকরো বিভিন্ন উপায়ে খাদ্যশৃঙ্খলে ও পানীয় জলে মিশে যায়। মাইক্রো প্লাস্টিকের উপস্থিতি বোতলবন্দি মিনারেল ওয়াটারেও পাওয়া যায়। এ এক বিপজ্জনক অবস্থা।আগেই বলা হয়েছে, প্লাস্টিক ক্যানসার রোগ সৃষ্টিতে বা এই রোগ বৃদ্ধিতে আরো সহায়ক হয়ে ওঠে। আরও কিছু রোগ সৃষ্টিতে বা বৃদ্ধিতেও প্লাস্টিকের ভূমিকা রয়েছে। শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, স্থলজ ও জলজ সব প্রাণীর ক্ষেত্রেই তা সমানভাবে প্রযোজ্য। এই বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় কিন্তু আজও পাওয়া যায়নি। আবার জলজ অনেক প্রাণী এসব প্লাস্টিকের টুকরো খাদ্য ভেবে ভুল করে খেয়ে নেয়। এই প্লাস্টিক কিন্তু কোনোভাবেই প্রাণীর হজম প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় না। ফলে তা প্রাণীদের দেহে আবিকৃত অবস্থায় থেকে যায় এবং যতদিন যায়, তার পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফল হয় মারাত্মক। অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিমি বা ওই ধরনের বড় জলজ প্রাণী শুধু প্লাস্টিক, মাইক্রো প্লাস্টিকই নয়, ম্যাক্রো প্লাস্টিক বা আকারে পাঁচ মিলিগ্রাম থেকে শুরু করে অনেক বড় মাপের হয়, খাদ্য ভেবে ভুল করে খেয়ে নেয়। ফলে একই পরিণতি ঘটে তাদের ক্ষেত্রেও।এমন ও দেখা গেছে প্লাস্টিক খেয়ে মৃত তিমি বা ওই জাতীয় বড় জলজ প্রাণীর পেটে দশ, বিশ বা তার থেকেও বেশি কেজি ওজনের প্লাস্টিক রয়েছে। আমাদের কারণে কী মর্মান্তিক পরিণতি ঘটছে ওইসব অসহায় প্রাণীদের। অন্যদিকে, ব্যবহার করা মাছ ধরা জালের যে খন্ডাংশ সমুদ্রের পানিতে অবলীলায় ফেলে দেওয়া হয়, তাতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে, চলচ্ছক্তিহীন হয়ে তিমি, কচ্ছপ প্রভৃতি জলজ প্রাণী একইভাবে মৃত্যুবরণ করছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সমুদ্রতলে কোনো কোনো অঞ্চলে কার্পেটের মত জড়িয়ে আছে প্লাস্টিকের ছোট বড় টুকরোগুলোই। ফলে শেওলা জাতীয় ক্ষুদ্র উদ্ভিদের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এই শেওলা খেয়েই ছোট মাছেরা জীবনধারণ করে। আর ক্ষুদ্র মাছেদের খেয়ে বড় মাছেরা বেঁচে থাকে। ফলে মাছেদের বৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হয়। মাছকে খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে মানুষ। ফলে মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সমুদ্রের পানির কোরাল জগৎ সৌন্দর্যের এক অপার লীলাভূমি। কোরাল জগতের মোহময় বর্ণবৈচিত্র, সৌন্দর্যপিপাসু মানুষদের মনকে সহজেই আকৃষ্ট করে। বিশ্বের উষ্ণম্ডলীয় অনেক দেশের সমুদ্রের পানিতে এই কোরাল জগৎ রয়েছে। কোরাল জগতের সৌন্দর্য উপভোগ কারার জন্য প্রতি বছর বিশ্বের হাজার হাজার পর্যটক কোরাল ক্ষেত্রগুলোতে ভিড় জমান। কোরাল জগৎ শুধু তার অপার সৌন্দর্যের জন্যই বিখ্যাত হয়ে ওঠেনি। কোরাল রিফ সমুদ্রের ঢেউ থেকে সমুদ্রোপকূলকে রক্ষা করার কাজেও সাহায্য করে। তাছাড়া কোরাল রিফ অসংখ্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থলও বটে। তাদের জীবনচক্র কোরাল রিফকে আশ্রয় করেই গড়ে ওঠে এবং এই রিফেই পূর্ণতা লাভ করে। অন্যান্যা কিছু কারণসহ সমদ্রের পানির প্লাস্টিকও এই কোরাল জগৎকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এমনকি, কোনো কোনো অঞ্চলের কোরাল শ্রেণি ইতিমধ্যে হয় ধ্বংস হয়ে গেছে, নয়তো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের খ্যাতি বিশ্বময় ছড়িয়ে আছে। এই রিফও আজ ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
প্লাস্টিক সমুদ্র পানির বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের সাথে বিক্রিয়া ঘটিয়ে কিছু বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করে। এসব বিষাক্ত পদার্থই সংবেদনশীল কোরাল প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আরেকটি কারণ হল, সমুদ্র পানিতে ভেসে চলা ছোট-বড় প্লাস্টিকের অসংখ্য টুকরো কোরাল শ্রেণিতে আটকা পড়ে যায়। এসব প্লাস্টিকের টুকরো দিনের পর দিন কোরালের গায়ে লেগে থাকে।
দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে সম্পূর্ণ জনমানববর্জিত ছোট্ট বিন্দুর মতো একরত্তি একটি দ্বীপ হেন্ডারসন আইল্যান্ড। আয়তনে ম্যনহাটন শহরের আধা এই ছোট্ট দ্বীপটির অন্তত তিন হাজার মাইলের মধ্যে কোনো মনুষ্যবসতি নেই। অথচ, কী আশ্চর্য, হেন্ডারসন দ্বীপের তটরেখা জুড়ে ছড়িয়ে থাকতে দেখা গেল ১৯ টন বর্জ্য। দ্বীপময় ছড়িয়ে আছে কম করে ৩ কোটি ৭০ লক্ষ নানা আয়তনের প্লাস্টিকের টুকরো। হিসাব করলে দাঁড়ায় প্রতি বর্গমিটারে প্রায় ৬৭২টি প্লাস্টিক বর্জ্যরে টুকরো। এই দ্বীপে এল কোথা থেকে এত প্লাস্টিক? সন্দেহ নেই, আমাদের মতো সমুদ্রনিকটতবর্তী দেশগুলো থেকেই প্লাস্টিক বর্জ্য প্রথমে এসে পৌঁছায় সমুদ্রে আর তারপর স্রোতের ঘূর্ণিপাকে ঢেউয়ের ধাক্কায় ধাক্কায়, তার ভবিতব্য হয় হেন্ডারসনের মতো একফালি দ্বীপ অথবা সমুদ্রেই তা থেকে যায় অনন্তকালের জন্য। কাচের বোতল সমুদ্রে অক্ষত থাকে, প্রায় হাজার চারেক বছর। কিন্তু কোনো কোনো প্লাস্টিকের বোতল অক্ষত থেকে যেতে পারে আদি থেকে অনন্তকাল। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লক্ষ টন প্লাস্টিকের অন্তিম আশ্রয় সমুদ্র। আর এর বড় অংশই সমুদ্রে আসে দূষিত নদীগুলোর মাধ্যমে। সমুদ্রে এসে পৌঁছানো প্লাস্টিকের দুই-তৃতীয়াংশেই বয়ে নিয়ে আসে বিশ্বের ২০টি সর্বাধিক দূষিত নদী, যার মধ্যে চীনের ইয়াংসি, ইন্দোনেশিয়ার প্যাসিগ আর আমাদের পদ্মা সমেত ১৫টি এশিয়ার। এই বিপুল পরিমাণ অক্ষয়, অভঙ্গুর প্লাস্টিকের বড়, ছোট এমনকি আনুবীক্ষণিক টুকরোর দূষণে একাধিক বিপন্ন প্রজাতিসহ প্রায় ২২৭০টি সামুদ্রিক প্রজাতি সরাসারি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। খুব সম্প্রতি ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী এথেন্সকেন্দ্রিক পেলাগোজ কেটাসিয়ান রিসার্চ ইন্সটিটিউটের গবেষকরা গ্রিসের সমুদ্রে স্পার্ম হোয়েল প্রজাতির মৃত তিমিরের প্রায় প্রত্যেকের পাকস্থলীতে প্রচুর পরিমাণে প্লাস্টিক পেয়েছেন। গত জানুয়রিতেও একই ভাবে উত্তর সাগরের তীরভূমিতে এসে মারা যাওয়া ২৯টি তিমির সুরতহাল করতে গিয়ে তাদের পেটেও পাওয়া গিয়েছিল দলা পাকানো বড় বড় প্লাস্টিকের টুকরো। যেসব সামুদ্রিক মাছ আমরা খাই, তার মাধ্যমে আমাদের দেহেও সবার অলক্ষ্যে প্রতিদিন ঢুকে পড়ছে আণবীক্ষণিক প্লাস্টিক তন্ত বা মাইক্রোপ্লাস্টিক চিপস।
ইউসি ডেভিস সম্প্রতি দেখিয়েছেন, ইন্দোনেশিয়া ও ক্যালেফোর্নিয়ায় মাছের বাজারে বিক্রি হওয়া মাছের অন্তত ২৫ শতাংশের দেহে পাওয়া গেছে প্লাস্টিক অবশেষ। কিন্তু শুধু সমুদ্রই নয়, কৃষিজমি থেকে পানিসেচ, এমনকি পানীয় জল পর্যন্ত আজ প্লাস্টিক দূষণের কবলে। গত বছর সেপ্টেম্বরে আমেরিকার মিনসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক কাম্পালা, দিল্লি, জাকার্তা, ইউরোপের সাতটি ও মার্কিন মুলুকের একাধিক শহর থেকে মোট ১২৯টি কলের পানির নমুনা পরীক্ষা করে ৮৩ শতাংশ নমুনাতেই প্লাস্টিকের অতিক্ষুদ্র আণুবীক্ষণিক তন্তর অস্তিত্বের প্রমাণ পান।
শুধু পানিভাগেই নয়, স্থলভাগেও প্লাস্টিক নানাভাবে দূষণ ছড়িয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। এই দূষণের ফলে মানুষসহ স্থলজ সকল প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষিক্ষেত্রে প্লাস্টিকের উপস্থিতি কৃষিজাত শস্যের ফলনে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। বর্ষার মরশুমে শহরাঞ্চলের নালা-নর্দমায় জমে থাকা প্লাস্টিক রাস্তায় পানি জমার কারণ হয়ে উঠছে। বর্ষব্যাপী নালা-নর্দমায়, রাস্তাঘাটে, বাড়ির আনাচে-কানাচে ফেলে রাখা প্লাস্টিকের গায়ে আটকে থাকা পানিতে মশার বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করছে। বায়ুমন্ডলেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা ভীষণভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এইসব কণা শ্বাসক্রিয়ার সাথে জীবদেহে প্রবেশ করে জীবদেহের ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

তরুণদের সুযোগ দিন

বর্তমান তরুণ প্রজন্ম কাজে বিশ্বাস করে, কথায় নয়। বড় কষ্ট লাগে যখন দেখি, আমাদের দেশে তরুণ বেকারের সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অধিক। এই বেকার তরুণদের মাধ্যমে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। এদের চিন্তাচেতনা আর বুদ্ধি যদি কাজে লাগাতে পারে রাষ্ট্র, তবে বাংলাদেশ পরিণত হবে সোনার বাংলায়। বর্তমান তরুণ সমাজ এটাই চায়। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে তরুণ সমাজের বিকল্প নেই। একটা কথা সবার মনে রাখতে হবে, আজকের তরুণরাই আগামী দিনে দেশ পরিচালনা এবং বড় বড় কাজের নেতৃত্ব দেবে। এখন থেকে যদি তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তোলা যায়, তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আরও সুন্দর হবে। তাই দেশ গঠনে তরুণদের চাওয়াকে যেমন গুরুত্ব দিতে হবে, ঠিক তেমনি তাদের পর্যাপ্ত সুযোগও দিতে হবে। আজ দেশে লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার তরুণ যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যাদের চাইলে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারে সরকার। তরুণদের দাবি একটাই, পর্যাপ্ত পরিমাণ কর্মসংস্থান। দেশে যেন বেকার না থাকে। মনে রাখতে হবে, সরকারের প্রধান যিনিই হন না কেন, তরুণদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করলেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন।
আজহার মাহমুদ,চট্টগ্রাম।

নকল-ভেজাল ওষুধের ছড়াছড়ি।

কামরুল হাসান | প্রকাশের সময় : ৮ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০৪ এএম
প্রতিটা মানুষ চায় সুস্থতার সাথে বেঁচে থাকতে। আর এই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্যই আমাদের জীবনের সাথে চলে আসল যুদ্ধ। আমরা অসুস্থ হওয়ার সাথে সাথে সুস্থ হতে মরিয়া হয়ে উঠি এবং চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হই এবং ওষুধ সেবন করে থাকি। আর বেঁচে থাকা এবং সুস্থ থাকার সংগ্রামে রোগ নিরাময়কারী ওষুধ যদি হয় ভেজাল, নকল এবং মানহীন তাহলে কীভাবে সুস্থ থাকা সম্ভব? ভেজাল ওষুধ কতটা মারাত্বক হতে পারে এ বিষয়ে মোটামুটি সবাই অবগত। ধরা যাক, আপনার কোনো সংক্রামক রোগ হয়েছে। সেক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার অপরিসীম। জীবাণু দ্বারা দেহের কোনো অঙ্গ-প্রতঙ্গ আক্রান্ত হলে জীবাণু টিকে থাকার জন্য যুদ্ধ শুরু করে। এই ক্ষেত্রে শরীর তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মাধ্যমে বা অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠার জন্য জীবাণু ধ্বংস করার কাজ করে। দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে বা নষ্ট হয়ে গেলে এবং উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা না হলে জীবাণু দেহকে ধ্বংস করার কাজে লেগে যায়। এর মানে হলো, মারাত্বকভাবে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে যে পরিমাণ নকল ওষুধ উৎপাদন, মেয়াদহীন ওষুধ পুনঃ প্যাকেটজাতকরণ এবং ভেজাল ওষুধের সয়লাব দেখা যায় তা পৃথিবীর আর কোনো দেশে দেখা যায় না। যে সকল ওষুধ আসল নয় বা সঠিক কাঁচামাল দিয়ে তৈরি নয় সেটাই ভেজাল বা নকল ওষুধ। যে ওষুধ সঠিক কাঁচামাল ছাড়া, মান-নিয়ন্ত্রণহীনভাবে তৈরি করা হয় সেটাই হলো নকল ওষুধ। উৎপাদন এবং এই ওষুধ যখন মানুষের দোড়-গোড়ায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয় তখন সেই পদ্ধতিকে বলা হয় নকল ওষুধ বাজারজাতকরণ। তবে এটা সত্য যে, আমাদের দেশ ছাড়াও প্রায় সকল দেশেই নকল ও ভেজাল ওষুধ কম হলেও কিছুটা পাওয়া যায়। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো পাকিস্তান, ভারত, ল্যাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকা। পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায় , বিশে^র উৎপাদিত প্রায় ১৫ শতাংশ ওষুধে ভেজাল রয়েছে, যার মাঝে এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে এর পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যানে বাংলাদেশেও কম নয়, ১৯৮০ থেকে ১৯৮২ সাল নাগাদ ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে কয়েক হাজার শিশুর মৃত্যু হয়েছিল, যা সরকাররে ওষুধ প্রসাশনের মতে, দুই হাজারের অধিক হয়েছিল। আবার ২০০৯ সালের মাঝামাঝিতে শুধুমাত্র ভেজাল প্যারাসিটামল ওষুধ সেবনে ২৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল।
আসল ওষুধ উৎপাদনের বদলে নকল ওষুধ উৎপাদনকারী বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে বাংলাদেশে। তা আরো দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে আইনের সঠিকভাবে প্রয়োগ না হওয়ার কারণে। আইনশৃংখলা বাহিনী হাতে গোনা কিছু ওষুধ বিক্রেতা ও কিছু প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় এনে জরিমানা করে ছেড়ে দিচ্ছে, আবার কিছু মামলাও হচ্ছে। কিন্তু প্রতিকার নেই। কারণ, ঐসকল অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ী সাময়িকের জন্য থেমে থাকলেও পুনঃরায় একই পথ অবলম্বন করে।
দিন দিন প্রশস্ত হচ্ছে নকল, ভেজাল ওষুধের বাজার। এর অনেক কারণ সহজেই লক্ষযোগ্য। কিছু প্রধান কারণ উল্লেখ করতে চাই। (১) ইন্টারনেটের ব্যবহার জীবন চলার পথকে যেমন সহজ করেছে; সেই সাথে ইন্টারনেটের মারাত্বক অপকার রয়েছে। এই ইন্টারনেটকে কাজে লাগিয়ে অনলাইন ভিত্তিক কিছু প্রতিষ্ঠান ভেজাল ওষুধ সরাসরি ক্রেতার হাতে পৌঁছে দিচ্ছে। (২) রাস্তার আশে পাশে, ছোট-বড় হাট-বাজারে ছত্রাকের মতো গড়ে উঠা কিছু ওষুধের দোকান নকল ওষুধ বিক্রয়ের মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে নকল ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে। (৩) তথ্যমতে, দেশে প্রায় ২৫-২৬ হাজার রকমের ওষুধ তৈরি হয়, যার মধ্যে সরকার মাত্র ৪ হাজার রকমের ওষুধ পরীক্ষা করে দেখতে পারে। ফলে ভেজাল, নকল এবং নিম্নমানের ওষুধ ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়ছে দেশের সব জায়গায়। আর এভাবেই ধীরে ধীরে যেমন বাড়ছে ভেজাল ওষুধের বাজার; তেমনি মানুষের মৃত্যু ঝুঁকিও পাল্লা দিয়ে বেড়ে যাচ্ছে।
দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভেজাল, নকল ওষুধের পরিসংখ্যান বেশি। দেশের মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ কম হলে দেখা যায় নিম্ন থেকে মধ্যম আয়ের মানুষ কঠিন রোগেও দামী ওষুধ কেনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মুনাফালিপ্সু কিছু মানুষ কম দামে ভেজাল ওষুধ ছড়িয়ে দেয়। তাই ভেজাল, নকল ওষুধের ব্যাপারে সরকারের আরো সজাগ হতে হবে। তেমনি সচেতন হতে হবে প্রতিটা মানুষকে। চীনে ওষুধ এবং খাদ্য দ্রব্যে ভেজাল মিশালে মৃত্যুদন্ডের বিধান আছে। যদিও আমাদের বাংলাদেশে সেটা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবে আমরা দেশের জনগণ যদি নকল, ভেজাল ওষুধ চিনতে পারি, তাহলে ভোক্তা অধিকার আইনে মামলা করার সুযোগ পাবো। সুতরাং আমরা চেষ্টা করলে কিছু নিয়মে নকল ওষুধ চিনতে পারবো। যেমন, ১. ওষুধ কেনার সময় ওষুধের গায়ে যে সিল থাকে সেটি ভালো করে খেয়াল করতে হবে। কোনো প্রকার গলদ মনে হলে সে ওষুধ এড়িয়ে চলা ভালো। প্রয়োজনে অন্য কোনো দোকান থেকে ওষুধ কিনতে হবে। ২. আপনি যে ওষুধ খাচ্ছেন তা পরের বার কেনার সময় একই ওষুধ কিনা খালি লেভেলের সাথে মিলিয়ে কেনা ভালো। তাতে নকল ওষুধ কিনা কিছুটা হলেও যাচাই করতে পারবেন। ৩. ওষুধ কেনার সময় দাম একটি বড় ব্যাপার। দাম কম বেশি বা গড়মিল মনে হলে সে ওষুধ এড়িয়ে যাওয়া ভালো। নকল, ভেজাল ওষুধের দাম কম হয়ে থাকে। ৪. ওষুধের প্যাকেটে উৎপাদন এবং মেয়াদ দেখে নিন। ৫. আমাদের দেশে প্যানাসিয়া ডট লাইভ নামে একটি ওয়েব সাইট আছে। সেখানেও আপনার ওষুধটি সঠিক কিনা যাচাই করতে পারেন।
পরিশেষে শুধু বলতে চাই, যারা ভেজাল, নকল ওষুধ তৈরি করছে তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তির আওতায় আনা খুবই জরুরি। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশে ১৯৪০ সালের ড্রাগ অ্যাক্ট বা ওষুধ আইন বলবৎ আছে। এ আইনের আওতায় যে শাস্তির কথা বলা হয়েছে তা খুবই নগন্য। অপরাধের তুলনায় শাস্তির মাত্রা এতই কম যে তাতে অপরাধ ও অপরাধীর ওপর তেমন কোনো প্রভাব পড়ছে না। নকল, ভেজাল ও ক্ষতিকর ওষুধ উৎপাদন ও বিক্রি করার মাধ্যমে মানুষ হত্যার শাস্তি এক বা দুই লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে এক, দুই বা তিন মাস জেল গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে আইনকানুন পরিবর্তন করে আরো কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে, যাতে করে আর কেউ কোনো সময় নকল, ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করার সাহস না পায়। সেই সাথে দেশের সকল ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত ওষুধ ও প্রতিষ্ঠানকে ওষুধ প্রশাসনের নজরে আনতে হবে।
লেখক: আইনজীবী এবং কলামিস্ট

রাজধানীর এই অচলাবস্থার নিরসন হবে কবে।

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ১১ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০৩ এএম গত সপ্তাহে বৃষ্টিতে ঢাকা শহরের কী অবস্থা হয়েছে তা সকলেরই জানা। মতিঝিল, ফকিরাপুল, শান্তিনগর, ধানমন্ডিসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো হাঁটু ও কোমর সমান পানিতে তলিয়ে যায়। এমনকি প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ও পানি ঢুকে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। মনে হয় রাজধানী যেন পানিতে ভাসছে। কারুকাজ সমৃদ্ধ ভবনগুলো যেন পানির তলদেশ থেকে গড়ে তোলা হয়েছে। যানবাহনগুলো ডুবে ডুবে চলছে। অনেক যানবাহন অচল হয়ে পানির মধ্যেই ভাসতে থাকে। সব দেখে মনে হচ্ছে, রাজধানীতে এখন উভচর যানবাহন নামানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। গত সপ্তাহে কয়েক ঘন্টার বৃষ্টিতে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। বৃষ্টি এক-দুই ঘন্টা হলেও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে থাকা সড়ক থেকে পানি নামতে লেগে যায় পাঁচ-ছয় ঘন্টা। এ এক ভয়াবহ দৃশ্য। এ চিত্র দেখে বোঝার উপায় নেই এটি কোনো রাজধানীর দৃশ্য। মনে হবে, বর্ষার পানিতে নিমজ্জিত গ্রামীণ কোন জনপদ। বিশ্বের আর কোন দেশের রাজধানীর রাস্তা-ঘাট বৃষ্টির পানিতে ঘন্টার পর ঘন্টা এভাবে তলিয়ে থাকে কিনা আমাদের জানা নেই। বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের শহর ঢাকার এ দুর্দশা যুগের পর যুগ ধরে চলছে। এ থেকে পরিত্রাণের কোন আশা তারা দেখছেন না। এভাবেই তাদের বসবাস করতে হবে এবং চলতে হবে, এ যেন তাদের নিয়তি। দুই. দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মেগা সিটি ঢাকা। বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে একটি। প্রায় চারশ’ বর্গকিলোমিটারের এই শহরের লোকসংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় পঁচিশ হাজার মানুষের বসবাস। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার মানুষ এ শহরে প্রবেশ করছে। ঢাকামুখী মানুষের স্রোত প্রতিদিনই বাড়ছে। ঠেকানোরও উপায় নেই। সবারই ধারণা, একবার ঢাকায় যেতে পারলে জীবন বদলে যাবে। তাদের এই মনোভাব রাজধানীর সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সারা দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গড় হার যেখানে দেড় শতাংশ, সেখানে ঢাকায় সাড়ে পাঁচ শতাংশ এবং তা ক্রমেই বাড়ছে। বলা হচ্ছে, আগামী দুয়েক-বছরের মধ্যে ঢাকা হবে বিশ্বের তৃতীয় জনবহুল শহর। নাইজেরিয়ার লাগোসের পর জনসংখ্যা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ঢাকা দ্বিতীয়। যতই দিন যাবে, জনসংখ্যার বৃদ্ধির সাথে সাথে ঢাকার পরিস্থিতি যেমন করুণ হবে, তেমনি সুযোগ-সুবিধাও অপ্রতুল হয়ে উঠবে। এমনিতেই মেগা সিটির যে বৈশিষ্ট্য এবং সুযোগ-সুবিধা থাকে, তার অনেক কিছুই ঢাকায় নেই। এর আমেজ কেমন হয়, এ অভিজ্ঞতা নগরবাসীর কোনদিনই হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে হবে কিনা সন্দেহ। নগরবিদরা মনে করছেন, মেগা সিটি যেভাবে পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠে, ঢাকা সেভাবে গড়ে উঠেনি এবং উঠছেও না। বলা বাহুল্য, একটি দেশের রাজধানী তার সভ্যতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। চেহারায় যেমন মানুষের মনের ভাব প্রতিফলিত হয়, তেমনি রাজধানীর চিত্রের মাধ্যমে দেশের সার্বিক পরিস্থিতির চিত্র পাওয়া যায়। প্রখ্যাত আইরিশ ঔপন্যাসিক ও কবি জেমস জয়েস তার প্রিয় শহর ডাবলিনকে নিয়ে বলেছেন, ‘আমি যদি ডাবলিনের হৃদয় স্পর্শ করতে না পারি, তবে বিশ্বের আর কোন শহরের হৃদয় স্পর্শ করতে পারব না।’ প্রবাস জীবনে থেকেও ডাবলিনের প্রতি তার এই আকুতি ঝরে পড়েছিল। প্রিয় শহর ঢাকা নিয়ে এর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তা ব্যক্তিদের মধ্যে এমন তাড়না যে নেই, তা ঢাকার দুর্দশা দেখেই বোঝা যায়। নগরবিদরা ঢাকাকে এখন সভ্য নগর হিসেবে মনে করেন না। ময়লা আবর্জনা ও ইট-পাথরের ডাম্পিং শহর হিসেবে বিবেচনা করেন। শুধু নগরবিদরা নন, বিশ্বের খ্যাতিমান জরিপ সংস্থা যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জরিপে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে বসবাস অনুপযোগী ও অযোগ্য শহর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সংস্থাটির জরিপে বেশ কয়েকবার বিশ্বের বসবাস অনুপযোগী ও অসভ্য নগরীর তালিকায় ঠাঁই পায়। ইকোনমিস্টের জরিপের সূচক তৈরি করা হয় ৩০টি মানদন্ডের ভিত্তিতে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা, অপরাধ সংঘটনের হার, স্বাস্থ্যসুবিধা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং অবকাঠামো। ১০০ নম্বরের মধ্যে ঢাকা পেয়েছিল ৩৮, অর্থাৎ ফেল। ঢাকা চিহ্নিত হয় অসভ্য বা বসবাস অনুপযোগী নগরী হিসেবে। এই অসভ্য নগরীতেই আবার জমির দাম ও বাড়িভাড়া পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি। এখানে এক শতাংশ জায়গার দাম গড়ে ২ কোটি টাকা এবং প্রতি বর্গফুট আবাসিক বাসাভাড়া ২০ থেকে ২৫ টাকা। যানজটে প্রতি বছর ক্ষতি হয় প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ শতাংশ। এ নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কোন মাথাব্যথা আছে বলে প্রতিয়মান হচ্ছে না। সংকট উত্তরণে কার্যকর ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেয়ার আশানুরূপ তৎপরতা দেখা যায় না। এমনকি বিদ্যমান সুবিধাটুকুও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ধরে রাখতে পারছে না। ফলে অসভ্য নগরী হিসেবে চিহ্নিত ঢাকা আরও অসভ্যতার পথেই হাঁটছে। তিন. রাজধানীর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণ এমন যে, বছরের পর বছর নগরবাসীকে সীমাহীন দুর্ভোগে রাখতে পারলেই যেন তাদের শান্তি। নগরবাসীকে তারা নাগরিক হিসেবেই মনে করে না। অথচ নগরবাসী ট্যাক্স দিচ্ছে এবং এই ট্যাক্সের পয়সাই সংস্থাগুলো পরিচালিত হচ্ছে। বিনিময়ে তারা ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না। তাদের জীবন অতিষ্ঠ করার যতরকম সমস্যা আছে, তার সবকিছুই জিইয়ে রেখেছে। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য ও পরিতাপের বিষয় আর কিছু হতে পারে না। বিগত ৪০ বছরেও পানিবদ্ধতা নিরসনে ওয়াসা একটি আধুনিক ড্রেনেজ সিস্টেম গড়ে তুলতে পারেনি। পঞ্চাশ-ষাটের দশকের ঢাকা উপযোগী যে ড্রেনেজ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, তার উপর নির্ভর করেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা ওয়াসার বিপনন ও ব্যবস্থাপনা শাখার একজন নির্বাহী প্রকৌশলী বলেছেন, ঘন্টায় ২০ মিলিমিটার বৃষ্টি হবে বিবেচনায় নিয়ে ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা করা হয়। এর চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হলেই পানিবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। কিছু এলাকায় সিটি কর্পোরেশনের ১২০০ মিলিমিটার ব্যাসের পাইপ লাইন রয়েছে। ওয়াসার পাইপ লাইন ৯০০ মিলিমিটারের। ফলে সিটি কর্পোরেশনের পাইপ থেকে প্রবাহিত পানি ওয়াসার পাইপ লাইন ধারণ করতে পারে না। এতে অনেক জায়গায় পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। তার এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা কতটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ বছরের পর বছর চলে গেলেও ওয়াসা এ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে পারছে না। পরিকল্পিত ড্রেনেজ সিস্টেম গড়ে তুলতে পারছে না। আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে বৃষ্টির হার যে প্রতি বছর বাড়ছে বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না। গত সপ্তাহে ৬২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়াবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছেন ভবিষ্যতে বৃষ্টির হার আরও বাড়বে। তখন পানিবদ্ধতায় ঢাকা শহর অচল হয়ে পড়বে। এখনই সামান্য বৃষ্টিতে নগরীর অধিকাংশ রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির পানি ও ড্রেনের পানি একাকার হয়ে অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যেই সংস্কারের নামে চলছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি। প্রতিনিয়ত চরম দুর্ভোগে পড়েছে নগরবাসী। পানিবদ্ধতার কারণে গর্তে পড়ে অনেক মানুষ যেমন আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন, তেমনি তলিয়ে থাকা বিদ্যুতের ছেঁড়া তারে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। এর দায় কেউ নিচ্ছে না। বৃষ্টির মৌসুমে নির্বিচারে রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে মূল সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির মহোৎসব কেন শুরু হয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কেন এ সময়ে অনুমতি দেয়, এ নিয়ে নগরবাসীর প্রশ্ন ও ক্ষোভ দীর্ঘ দিনের। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যে নগরবাসীর এ ক্ষোভের কোন তোয়াক্কা বা ভ্রুক্ষেপ করে না, বর্ষা মৌসুমে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির সংস্কৃতি বন্ধ না হওয়া থেকেই বোঝা যায়। নগরবাসীর এই ভোগান্তি কবে শেষ হবে, এ নিয়ে সিটি কর্পোরেশন ও ওয়াসা, এমনকি সরকারের পক্ষ থেকেও কখনো কোন নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। কেউই নগরবাসীর চিরন্তন এই সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছে না। সিটি কর্পোরেশন দুই ভাগ করেও কোন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ একটু তৎপর ও সচেতন হলেই পানিবদ্ধতার সমস্যা নিরসন সম্ভব। সিডিউল পরিবর্তন করে শুষ্ক মৌসুমে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলে অনেকাংশে ভোগান্তির অবসান হয়। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই সিদ্ধান্ত নেয়ায় জনসাধারণের ভোগান্তি অনেকটাই লাঘব হয়েছিল। কঠোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তখন বর্ষা মৌসুমে সব ধরনের রাস্তা খোঁড়ার কাজ বন্ধ করা হয়। ফলে নগরবাসীকে খুব বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি। অর্থাৎ সদিচ্ছা থাকলে কোন কিছুই অসম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে এ ধারা অব্যাহত থাকেনি। বর্ষা মৌসুমের কিছু দিন আগে থেকেই রাস্তা খোঁড়া সংস্কৃতি ফিরে আসে। জনসাধারণের ভোগান্তিও শুরু হয়। বিষয়টি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন জনসাধারণকে ভোগান্তিতে ফেলে আনন্দ পান। তাদের আনন্দিত হওয়ার অন্তর্নিহিত কারণ যে আছে, তাতে সন্দেহ নেই। বর্ষায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি হলে বৃষ্টির অজুহাতে কাজ বিলম্বিত হয়, কাজ বিলম্বিত হলে পুনরায় অর্থ বরাদ্ধ হবে এবং তা থেকে ঠিকাদারের যেমন লাভ, তেমনি সংশ্লিষ্ট অসৎ কর্মকর্তাদেরও কমিশন প্রাপ্তির লাভ রয়েছে। অর্থাৎ দুর্নীতির ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্যই বর্ষায় রাস্তা খোঁড়ার সংস্কৃতি শুরু হয়। ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সমস্যা সৃষ্টি এবং বিশ্বে রাজধানীর বদনাম হওয়ার মতো এমন কর্মকান্ড হয় কিনা আমাদের জানা নেই। এ সংস্কৃতি বন্ধ না হলে কোন দিনই নগরবাসীর ভোগান্তির অবসান হবে না। বৃষ্টিতে রাজধানীর আশপাশের শহরতলী এলাকাগুলোর অবস্থা শোচনীয় হওয়া নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে ডিএনডি বাঁধের ভেতরের এলাকাগুলো সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়া এবং সেখানে বসবাসকারী মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কথা প্রতি বছরই উঠে আসে। বর্ষা ও বৃষ্টি এ এলাকার মানুষের কাছে অভিশাপ হয়ে আসে। এ বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। একদিনের বৃষ্টিতেই এলাকার কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। তাদের দুর্দশার অন্ত থাকে না। ষাটের দশকে নারায়ণগঞ্জের দুইটি ইউনিয়নসহ ঢাকা ও শহরতলীর ৮ হাজার ৩৪০ হেক্টর জমিতে সেচের জন্য ডিএনডি বাঁধ প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। সেখানে ১০০ কিলোমিটার খালও খনন করা হয়। কালক্রমে অবৈধ দখলের কারণে প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম প্রায় সব খাল ভরাট হয়ে গেছে। এতে জমে থাকা পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে না। ৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ডিএনডি বাঁধের ভেতরের পানি সরাতে প্রতি সেকেন্ডে ১২৮ কিউসেক পানি নিষ্কাশন ক্ষমতার ৪টি এবং ৫ কিউসেক ক্ষমতার ২৫টিসহ রয়েছে ৩০টি পাম্প। এসব পাম্প দিয়ে পুরোপুরি পানি নিষ্কাশন সম্ভব নয়। ফলে বাঁধের ভেতর বসবাসকারীদের বৃষ্টি ও বর্ষায় পানিবদ্ধ অবস্থায় থাকতে হয়। শহরতলী মূল শহরের বাইরে হলেও দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে এগুলো শহরের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছে। এসব এলাকার সমস্যা ও ড্রেনেজ সিস্টেম মূল নগরীর সাথে যুক্ত হওয়ায় এর প্রভাব রাজধানীতে পড়ছে। রাজধানীর ড্রেনেজ সিস্টেম সঠিকভাবে গড়ে না ওঠায়, শহরতলীর ড্রেনেজ সিস্টেমের সাথে যুক্ত হয়ে পানিবদ্ধতাকে আরও জটিল করে তুলছে। এ কথা অনস্বীকার্য, আশপাশের এলাকা ড্রেনেজ সিস্টেমের উন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি না করলে মূল শহরের সুযোগ-সুবিধারও ব্যঘাত ঘটে। রাজধানী ঘিরে যেসব নদী রয়েছে, রাজধানীকে সজীব ও পানিবদ্ধতামুক্ত রাখতে এগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবৈধ দখলের কারণে রাজধানীর ধমনী হিসেবে পরিচিত নদীগুলোর স্বাভাবিক গতিধারা হারানোর পাশাপাশি এগুলোর অস্তিত্ব বিলীন হতে চলেছে। ফলে শহর থেকে প্রতিদিন যে বর্জ্য ও দূষিত পানি নিঃসরিত হয়, তা নদীতে গিয়ে পড়ছে এবং সেখানেই স্থির থেকে যাচ্ছে। স্বাভাবিক গতি না থাকায় নদীগুলো বাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বুড়িগঙ্গা এখন ঢাকার অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পানি এতটাই কালো ও বিষাক্ত যে, এতে কোন প্রাণের অস্তিত্ব নেই। অথচ আগে বিদেশি কোন রাষ্ট্রীয় অতিথি এলে এই বুড়িগঙ্গায়ই নৌ-বিহারে নিয়ে যাওয়া হতো। এটি ছিল আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন ভুলেও কোন রাষ্ট্রীয় অতিথিকে নৌ-বিহারে নিয়ে যাওয়া হয় না। রাজধানীর এ অবস্থার জন্য বিশ্লেষকরা মূলত রাজনীতিকদের দায়ী করেন। তারা মন্তব্য করেন, ‘রাজনীতিকদের কারণেই অপরিকল্পিতভাবে ঢাকা মহানগরী গড়ে উঠেছে। রাজনীতির কারণেই ঢাকা কেন্দ্রীভূত বা অতি কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এখন পর্যন্ত দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি ঢাকামুখী। আগামীতে কি পরিণতি হবে তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে। তারা বলেন, ঢাকার স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সবচেয়ে খারাপ বলেই এই দুরবস্থা। চার. ঢাকা শহর সভ্য না হওয়ার অন্যতম কারণ সুষম পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের অভাব। যেভাবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ হচ্ছে, এ ধারা অব্যাহত থাকলে ঢাকা কখনোই বাসযোগ্য শহরে পরিণত হতে পারবে না। নগরবিদরা মনে করছেন, ঢাকা শহরের জন্য আর্থিক সামর্থ্য বড় ব্যাপার নয়, সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কার্যকর করাই প্রধান সমস্যা। ঢাকাকে বাসযোগ্য করে তুলতে হলে, প্রত্যেকটি সমস্যা আলাদাভাবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সমাধানে উদ্যোগ নেয়া জরুরী। যানজটের কারণে যে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়, তা নিরসন করতে পারলে এই অর্থ দিয়েই অন্যান্য সমস্যা সমাধান সম্ভব। বৃষ্টি মৌসুমে পানিবদ্ধতা যেহেতু নগরবাসীর জন্য চরম সমস্যা হয়ে দেখা দেয়, এই সমস্যা নিরসনে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। বিদ্যমান ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখা এবং সংস্কার কাজ বর্ষায় না করে শুষ্ক মৌসুমে করা বাঞ্চনীয়। রাজধানীতে এক সময় অসংখ্য প্রাকৃতিক খাল ছিল। খালগুলো বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন এবং শহরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। অবৈধ দখলের কারণে এসব খাল এখন আর নেই। দখলমুক্ত করে কিছু খাল উদ্ধার ও সংস্কার করতে পারলে পানিবদ্ধতা অনেকটাই কমে যেত। পাম্প বসিয়ে পানি নিষ্কাশন কোন স্থায়ী সমাধান নয়। পানিবদ্ধতা নিরসন করতে হলে ড্রেনেজ সিস্টেম উন্নত করতে হবে। সিটি কর্পোরেশন ও ওয়াসার সমন্বয়ে ড্রেনের পাইপ বসিয়ে স্থায়ীভাবে সমস্যা সমাধান করতে হবে। তা না হলে প্রতি বছরই বার বার রাস্তা খুঁড়তে হবে, অর্থের অপচয় হবে এবং জনভোগান্তিরও সৃষ্টি হবে। ঢাকাকে বাসযোগ্য ও পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মেয়াদের মহাপরিকল্পনা নেয়া এবং দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরী। darpan.journalist@gmail.com

অপরিকল্পিত শিল্পায়নে পরিবেশের বিপর্যয়।

বিশ্বে এখন যেভাবে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, কলকারখানা থেকে কার্বন নিঃসরণ এবং গাছপালা ধ্বংস করে বায়ুমন্ডলে কার্বন-ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে মানবজাতির অস্তিত্বই বিপন্ন করছে; শুধু মানবজাতি নয়, সমগ্র প্রাণিকুল ও উদ্ভিদজগৎ ধ্বংস করার ব্যবস্থা করছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, পুঁজিবাদ শুধু শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষেরই শত্রু নয়, তারা হল সমগ্র জীবজগতের শত্রু। তাদের তৎপরতার ফলে শুধু শ্রমিক শোষণ নয়, মানবজাতির অস্তিত্বই বিপন্ন হয়েছে। এখন পুঁজিবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে সমগ্র মানবজাতির শত্রু, এমনকি পুঁজিবাদীদের নিজেদেরও শত্রু। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো উদ্বেগ পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের নেই, ক্ষেত্রবিশেষে সেটা থাকলেও এর গুরুত্বের উপযুক্ত উপলব্ধি নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ কিন্তু এই যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর খনিজ জ্বালানির ২৫ শতাংশ ব্যবহার করছে এবং বায়ুমন্ডলে মোট কার্বন ডাই-অক্সাইডের ২২ শতাংশ ছাড়ছে। এদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মোট জনসংখ্যা পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় ৭৮ শতাংশ এবং তারা মোট জ্বালানির মাত্র ১৮ শতাংশ ব্যবহার করছে। এসব তথ্য থেকে প্রতিয়মান হয় যে, উন্নয়নশীল দেশগুলো যেসব জটিল পরিবেশগত সমস্যার সম্মুখীন তার অধিকাংশের জন্য উন্নত দেশগুলোর অতিভোগই দায়ী। বিশ্বজুড়ে উষ্ণতা বৃদ্ধির হার সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে, এতে করে বাড়বে বন্যা ও সাইক্লোন। ফলে মারাত্মকভাবে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। পরিবেশ দূষণের কারণে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর যতো মানুষের মৃত্যু হয় তার ২৮ শতাংশই মারা যায় পরিবেশ দূষণজনিত অসুখ বিসুখে। কিন্তু সারা বিশ্বে এ ধরনের মৃত্যুর গড় ১৬ শতাংশ। বাংলাদেশের নগরাঞ্চলে দূষণ ও পরিবেশের অবনতি হওয়ার কারণে বাংলাদেশকে অনেক মূল্য দিতে হচ্ছে। এর ফলে দেশটির ভালো প্রবৃদ্ধিও এখন হুমকির মুখে। এজন্য বিশ্বব্যাংক জলাভূমি দখল, ক্ষতিকর বর্জ্য ঠিকমত না ফেলা ইত্যাদিকে দায়ী ও তিনটি ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যথা- (১) পরিবেশগত অবনতির মূল্য, (২) পরিচ্ছন্ন ও টেকসই শহর এবং (৩) পরিচ্ছন্ন শিল্প প্রসারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। এক্ষেত্রে নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। দেশে সবুজ অর্থায়ন, পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির প্রসার, বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি উন্নতকরণ এবং পরিবেশগত সুরক্ষার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির উপরও গুরুতারোপ করা হয়েছে। বেশ কয়েকবছর পূর্বে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রকাশিত বিশ্বের ৯০ জন পরিবেশ বিজ্ঞানী কর্তৃক বলা হয়েছিল, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে আবহাওয়া চরম আকার ধারণ করবে, তীব্রমাত্রার সাইক্লোন হবে। ফলে খাদ্য উৎপাদন জীবিকা ও অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়বে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশই বেশি ক্ষতির শিকার হবে। ২০৫০ সালে সিডরের মতো সাইক্লোনে তিন মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। এতে প্রায় ৯৭ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে গরিবরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশে পরিবেশের অবক্ষয় ও দূষণ একটি বড় সমস্যা। উপর্যুপরি বন্যা, খড়া ও ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ জলবায়ু ও আবহাওয়ার অস্থিরতাসহ অন্যান্য পরিবেশগত সমস্যা এখন মানুষের নিত্যদিনের। এসবের মূলে মানুষের কর্মকান্ডই প্রধানত দায়ী। যথেচ্ছা বৃক্ষ নিধন, অধিক জনসংখ্যা, দারিদ্র্য, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, জোড়ালো শব্দের হর্ন, আবাসিক এলাকায় শিল্প কারখানা ও ইট ভাটার অবস্থান ইত্যাদি পরিবেশকে দূষিত করছে। পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক রিপোর্ট থেকে জানা যায় চীন বিশ্বকে পরিবেশগত ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। চীনের সরকার তিব্বত অঞ্চলেই একের পর এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। ২০২০ সালে আরও বড় আকারের বাঁধ নির্মাণের ফলে চীনের এক পঞ্চমাংশ নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাবে। অনেক নদীর পানি শুকিয়ে ছোট জলাশয়ে পরিণত হতে চলেছে। ৩৫০টি বড় হ্রদ একেবারে হারিয়ে গেছে। এর ক্ষতিকর প্রভাব চীনের সীমান্ত ছাড়িয়ে অন্যান্য অঞ্চলেও পড়ছে। চীনের এসব প্রকল্পে আন্তর্জাতিক স¤প্রদায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হিমালয় জুড়ে ব্যাপক হারে বনাঞ্চল ধ্বংসের ফলে উঁচু ভূমিগুলোতে অনেক প্রজাতির প্রাণির বিলুপ্তি ঘটেছে। তিব্বতের মালভূমি এখন বিশ্বব্যাপী গড় তাপমাত্রার চেয়ে তিনগুণ বেশি উষ্ণ। এর পরিবেশগত প্রভাব এশিয়া ছাড়িয়ে অন্যান্য স্থানেও পড়ছে। বাংলাদেশও পরিবেশগত ঝুঁকির মধ্যেই আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি এখন হুমকির মুখে। দেশে এখনও বন্ধ হয়নি পলিথিনের ব্যবহার। নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিনের ব্যবহারের কারণে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণহীনতার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু মানুষ নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন করে চলছে। পলিথিন ব্যবহার করে যেখানে সেখানে ফেলে দেয়া হচ্ছে। সেগুলো পানিবাহিত হয়ে ড্রেনে গিয়ে পড়ছে। ক্রমাগতভাবে ড্রেন বন্ধ হয়ে এক সময় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে মারাত্মকভাবে। বায়ুদূষণে ফিটনেসবিহীন যানবাহন মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এসব নিম্নমানের গাড়ি আমাদের পরিবেশকে ধুলিময় করে তোলে, যা মানবস্বাস্থের জন্যও অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাছাড়া ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো নিয়ন্ত্রণ করা দুরূহ হওয়ায় মারাত্মক দুর্ঘটনায় প্রায় প্রতিদিনই মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে, নরওয়েভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনআইএলইউয়ের সহায়তায় সা¤প্রতিক এক গবেষণায় ঢাকা শহরের বায়ুর গুণগত মানের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরের শুধু গাড়ির ধোঁয়া থেকে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ টন বস্তুকণা পিএম ২.৫ বাতাসে ছড়াচ্ছে। পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ আয়োজন রয়েছে। তবুও বাংলাদেশ বর্তমানে পরিবেশগত সূচকে ১৮০ দেশের মধ্যে সবচেয়ে তলানির দ্বিতীয় দেশ। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স¤প্রতি প্রকাশিত এই সূচকে বাংলাদেশ ১৭৯তম স্থানে রয়েছে। পরিবেশ সুস্বাস্থ্য সূচকে এদেশের অবস্থান ১৭৮ রাষ্ট্রের মধ্যে ১৭৮তম। অর্থাৎ সবচেয়ে তলানির দেশ। বায়ুমান সূচকে ১৮০ দেশের মধ্যে সবচেয়ে দ্বিতীয় খারাপ অবস্থা আমাদের বাংলাদেশের। অবস্থান ১৭৯তম। খাবার পানি ও স্যানিটেশনে ১২৮ দেশের মধ্যে ১২৮তম। কৃষি, বায়ুদূষণ ভারি ধাতু, প্রতিবেশ, বন ও সবুজ আচ্ছাদন, জলবায়ু ও জ্বালানি খাতে ও আমাদের অবস্থান পেছনের কাতারের দেশ। পরিবেশবিনাশী কার্যক্রম এখনই বন্ধ না করলে ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়নের অভিষ্ঠ অর্জনেও আমাদের পিছিয়ে পড়া দেশের কাতারেই থাকতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে বাংলাদেশ সংবিধান এর দ্বিতীয় ভাগে ১৮ক অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব-বৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণির সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন।’ বিপন্ন পরিবেশের প্রভাব থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সব জাতীয় সম্পদের টেকসই উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবহার বিষয়ে সমন্বিত সচেতনতার জন্য পরিবেশ সংক্রান্ত জ্ঞান ও আইন সম্পর্কে সচেতন করে তোলার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ, গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে এবং এনজিওগুলোর মাধ্যমে জনগণের সচেতনতা তৈরির কাজ অব্যাহত রাখা। পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ীদের বিরূদ্ধে ত্বরিত প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে পরিবেশ আদালত স্থাপন করা প্রয়োজন। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালায় যথাযথ প্রয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সমগ্র মানবসমাজের কর্তব্য নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য পুঁজিবাদকে উৎখাত করা। যদি না হয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতেই পুঁজিবাদ মানবজাতিকে ধ্বংস করবে। লেখক: উন্ন্য়ন ও পরিবেশ গবেষক এবং সহযোগী সদস্য, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা নয় চাই সুষ্ঠু পরিবেশ।

আফতাব চৌধুরী | প্রকাশের সময় : ১২ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০২ এএম, ইনকিলাব। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার ফাহাদের মা-বাবার বুক খালি। আবরার নেই। গত ৭ অক্টোবর বুয়েটের ছাত্র নামধারী কিছু যুবক আবরারকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ইতোমধ্যে তাকে কবরস্থ করা হয়েছে। সে আর কোনদিন ফিরে আসবে না। আর বলবে না মা ভাত দাও, বাবা পড়তে যাচ্ছি ভার্সিটিতে। এ আবদার চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। শোকে কাতর মা-বাবা আর কোনদিন আবরারকে দেখতে পাবেন না। দীর্ঘ ২১-২২টি বছর যাকে লালন পালন করে মানুষ হয়ে গড়ে উঠার জন্য, ভার্সিটিতে পাঠিয়েছিলেন। আশা ছিল, সে উপযুক্ত মানুষ হয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের মাধ্যমে মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করবে। তা আর হলো না। আবরারকে নিষ্ঠুর নির্মম এবং নির্দয়ভাবে হত্যা করার পর স্বীয় ভার্সিটিসহ দেশের বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হরতাল, ধর্মঘট, বিক্ষোভ, মানববন্ধনসহ প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রী, পেশাজীবী সংগঠনসহ সমাজের সকল স্তরের লোকজন এ নির্মম হত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাদের সকলের দাবি নির্মম এ হত্যাকান্ডে যারা জড়িত তাদের দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। আমরাও একমত। এটা করা না হলে দেশের বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হবে তাতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে এবং পরিস্থিতি সামাল দেয়া হবে একটা কঠিন কাজ। ইতোমধ্যে সরাসরিভাবে হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত ক’জন ছাত্র নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ প্রদান করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়–য়া ছাত্রদের এ আচরণ আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভাবর্মযাদাকে দেশে শুধু নয় বিদেশেও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তা নিশ্চিত বলা যায়। মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছাত্রদের বেপরোয়া মনোভাব এবং ছবি দেখে শুধু দেশের নয় অন্যান্য দেশের মানুষও আমাদের দেশের ছাত্রদের সম্বন্ধে কি ধারণা পোষণ করবে, এটা ভেবে দেখার বিষয়। এতে কি দেশের বাইরে আমাদের ভাবর্মযাদা নষ্ট হচ্ছে না? সচেতন নাগরিক বুদ্ধিজীবী এবং ক্ষমতাসীন সরকারের নেতা-নেত্রীদের এসব ভেবে দেখার বিষয়। দেশের জনসাধারণ ছাত্র রাজনীতির এ নমুনা দেখে বলতে গেলে হতাশ। সাধারণ মানুষও এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন। তারা সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহাবস্থানের মাধ্যমে শিক্ষার সুন্দর পরিবেশ প্রত্যাশা করে। তারা দেখতে চায়, তাদের সন্তানরা নিরাপদে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছে সরকার। আইনশৃংখলা রক্ষার দায়িত্বে আছে বিভিন্ন বাহিনী। কাজেই সন্ত্রাসীদের রশি টেনে ধরার চেষ্টা করে দায়িত্ব এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই কারো। এসব কর্মকান্ডের দায় দায়িত্ব বর্তাবে বর্তমান সরকারের উপরই। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি বাঞ্চনীয় বা বর্জনীয়, এ নিয়ে বিতর্ক মোটেই নতুন নয়। তবে সা¤প্রতিককালে এ বিতর্ক এক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। একদিকে ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধাচারীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পক্ষে সরব, অপরদিকে এর পক্ষাবলম্বীরা ছাত্র রাজনীতির পরিসর বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের গন্ডি ছাড়িয়ে স্কুলস্তর অবধি সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় সচেষ্ট। বর্তমান ছাত্র ভবিষ্যতের রাষ্ট্রচালক। সুতরাং রাষ্ট্র চালনার নীতি অর্থাৎ রাজনীতি বিষয়ে সচেতনতা ও জ্ঞানের অনুশীলন ছাত্রাবস্থায় হওয়া আবশ্যক। তাই ছাত্র রাজনীতির অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। রাজনৈতিক ঘটনাস্রোত ও ছাত্রসমাজ এই দুয়ের সংশ্লিষ্টতা অবশ্যই সাম্প্রতিককালের ব্যাপার নয়, ইতিহাস এর সাক্ষ্যবাহক। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এরূপ অনেক উদাহরণ লিপিবদ্ধ আছে। স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে সংঘটিত অনেক আন্দোলনে ছাত্র সমাজের জড়িত হবার ঘটনা সম্পর্কে আমরা অবহিত। ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে পুরোভাগে থেকে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন ছাত্রছাত্রীরা। এছাড়া আরো অনেক গঠনমূলক আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীদের সক্রিয় ভূমিকা প্রশংসনীয় ছিল। কাজেই ছাত্র রাজনীতি বা ছাত্রছাত্রীদের রাজনৈতিক আন্দোলন-ঘটনাবলীতে জড়িত হওয়া নিন্দনীয় বা সমালোচনার বিষয় হিসেবে গণ্য হওয়া ঠিক নয় যদি তা সঠিক পথে হয়ে থাকে। ছাত্র রাজনীতির সমর্থকদের বক্তব্য, রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রেখে রাজনীতির পাঠগ্রহণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির কাজটি করতে হবে ছাত্রাবস্থাতে। রাজনীতিতে অনীহা ছাত্রদের ভবিষ্যৎ রাজনীতিক হবার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। তাই ছাত্র রাজনীতির আবশ্যকতাকে মোটেই খাটো করে দেখা যাবে না। এ জন্য ছাত্র রাজনীতির পরিসর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের গন্ডি ছাড়িয়ে স্কুলস্তর অবধি প্রসারিত হবার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন এর প্রবক্তারা। তবে স্কুল পর্যন্ত এটিকে নিয়ে আসা উচিত নয়। কারণ স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোতে ব্যাঘাত ঘটবে, তারা বয়সের দিক থেকে অনেক ছোট। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত লক্ষিত হলে তথাকথিত ছাত্র নেতারা ছাত্রকূলের প্রকৃত হিতার্থে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পঠন পাঠনের মানোন্নয়ন ঘটিয়ে সুস্থ শৈক্ষিক পরিবেশ সৃষ্টিতে একেবারে বীতস্পৃহ। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতির কদর্যরূপ দীর্ঘদিন ধরে প্রতীত হচ্ছে। স্থানীয় বা জাতীয় স্তরের দলীয় রাজনীতির ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবে ছাত্র রাজনীতি পরিচিতি লাভ করেছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির লাগাম এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মুঠোয়। কলেজগুলোতে ইউনিয়ন দখলের লড়াইয়ে ছাত্রছাত্রীর নিজস্ব মতামতের চেয়ে দলীয় কর্মী তথা পেশী ও অর্থবলধারীদের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ও দাপট অধিক নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। এতে ছাত্রস্বার্থ চূড়ান্তরূপে উপেক্ষিত হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলো কৌশলে তাদের দলীয় প্রভাব বৃদ্ধির কাজটি সেরে নিতে সক্ষম হয়। রাজনৈতিক দলের ক্যাডার বাহিনী তৈরির কারখানা হয়ে উঠে কলেজগুলো। রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্র রাজনীতির সপক্ষে নানা আদর্শবাদ, ছাত্রসমাজে রাজনৈতিক সচেতনতার জাগৃতি তথা তাদের মধ্যে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রনেতার গুণাবলীর অনুশীলন ইত্যাদির কথা বলেন, কিন্তু আসল উদ্দেশ্য যে ছাত্রদের মধ্যে নিজ নিজ দলের প্রভাববৃদ্ধি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে অর্থের ছড়াছড়ি, মার-দাঙ্গা, অপহরণ, খুনখারাবি কিছুতে আপত্তি নেই তাদের। স্বভাবত ছাত্রনেতা হিসেবে তারা এমন প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেন-যারা উপরোক্ত কর্মকান্ডে সিদ্ধহস্ত বা সামান্য প্ররোচনাতে তা অবলীলাক্রমে করতে সক্ষম। যারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার চেয়ে দাদাগিরিকে প্রাধান্য দেয়, তারা ছাত্র রাজনীতির যোগ্যতা অর্জনে বহু যুগ এগিয়ে থাকে। এ ধরনের ব্যাপার প্রায় সর্বত্র ঘটছে। এখন অবধি কূটদলীয় রাজনীতির কুৎসিত অবয়ব দর্শনে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন অভিভাবক-নাগরিক শঙ্কিত হয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতির অবসান চান। সুশীল কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের দলীয় রাজনীতির সংস্রবমুক্ত রাখা উচিত। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের প্ররোচনায় বিপথগামী হতে পারে। যে ছাত্রজীবন ভবিষ্যতে শিষ্ট নাগরিক হবার গুণাবলী অধ্যয়ন ও আয়ত্বের সময়, সেটা কলুষিত হতে পারে যদি তারা এ অবস্থায় অর্থশক্তি-পেশীশক্তি নির্ভর রাজনীতির পাঠগ্রহণ করে। সর্বোপরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীর মধ্যে সৌভ্রাতৃবোধে চিড় ধরিয়ে শৈক্ষিক পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতিসাধিত হবে। অবশ্য এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এরূপ পরিস্থিতি থেকে সব রাজনৈতিক দল যে সমানভাবে স্বার্থসিদ্ধিতে সমর্থ হবে তা নয়। মূলত ভ্রষ্টাচার আশ্রিত দল এতে সর্বাধিক লাভবান হবে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কলেজে এ ধরনের ছাত্র রাজনীতি কেন্দ্রিক ইউনিয়নের দখলদারি ও খবরদারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য পঠন-পাঠনের ব্যাপারটিকে প্রহসনে পরিণত করছে। কলেজে দলবাজি-ইউনিয়নবাজিতে শতকরা বড়জোর যদি ৫ ভাগ ছাত্র জড়িত থাকে, কিন্তু তাদের দাপট ও দৌরাত্ম্যে বাকি ৯৫ ভাগ ছাত্রের পড়াশোনায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনে দায়সারা ভাব পরিলক্ষিত হয়। সুশীল ছাত্র ও সচেতন অভিভাবক নোংরা রাজনীতির সংক্রমণ-ক্লিষ্ট শৈক্ষিক পরিবেশ নিয়ে চরম হতাশাগ্রস্থ হন। অর্থ ও বাহুবলে বলীয়ান রাজনৈতিক দলের মদতপুষ্টে ছাত্র রাজনীতিতে অনৈতিকতা, হিংসা, উন্মত্ততা, জবর আধিপত্য বিস্তারের মনোভাব প্রকট হওয়ায় ছাত্র হত্যা-শিক্ষক হত্যার মতো নিকৃষ্ট ঘটনা শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতাকে কালিমালিপ্ত করছে। এ সর্বনাশা ছাত্র রাজনীতি থেকে পরিত্রাণ ও উত্তরণের জন্য ছাত্র রাজনীতির অবসান চাইছেন অনেকে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি বিভীষিকাময় রূপ ধারণ করেছে। ছাত্র রাজনীতিকে কালিমালিপ্ত করার জন্য এককভাবে দায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কদর্য দলীয় রাজনীতির অনুপ্রবেশ। কাজেই যেটা বন্ধ হওয়া দরকার সেটা ছাত্র রাজনীতি নয়, ছাত্র রাজনীতিতে দলীয় রাজনীতির অনুপ্রবেশ। ছাত্র রাজনীতির প্রচলিত ধারণার সংশোধন আবশ্যক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে সীমিত থাকা আবশ্যক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি থাকবে, ছাত্ররা নিজেদের মধ্যে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা করবে- এতে আপত্তির কিছু থাকতে পারে না। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অন্তর্নিহিত ব্যক্তিত্ব তথা নেতৃত্ব শক্তির বিকাশ ঘটবে যা পরবর্তীতে সমাজ ও রাষ্ট্রচালনায় সহায়ক হবে। এটিকে সার্বিক শিক্ষার এক অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। রাজনীতি শব্দকে সংকীর্ণ অর্থে ব্যাখ্যা না করে তার প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করতে হবে। রাজনীতি নিছক কোনো রাজনৈতিক দলের নীতি নয়, রাজনীতি হল রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি। কাজেই ছাত্র রাজনীতি দল-নিরপেক্ষ রাজনীতি হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে সমগ্র ছাত্রসমাজই একটি দল। এ ছাত্রসমাজকে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্র নেতার কাজ আর ছাত্রসমাজকে পরিচালনা করার নীতি ছাত্র রাজনীতি। রাষ্ট্র রাজনীতির হাতেখড়ি হবে এ ছাত্র রাজনীতি। কোনো রাজনৈতিক দলের স্তাবকতা বা তল্পিবহন করা ছাত্রসমাজের পক্ষে অমর্যাদাকর ও হানিকর। এটি ছাত্রনেতাদের অন্তর্নিহিত নেতৃত্ব গুণের বিকাশকে স্তিমিত ও বিকৃত করে তাদেরকে রাজনৈতিক নেতাদের ক্রীড়নকে পরিণত করে। রাজনৈতিক নেতারা তাদের ন্যস্ত স্বার্থ চরিতার্থ করতে ছাত্রদেরকে হাতিয়ারস্বরূপ ব্যবহার করেন। কাজেই ছাত্রাবস্থায় সক্রিয় দলীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হবার মোটেই ঔচিত্য বা আবশ্যকতা নেই। ছাত্রাবস্থা নেতৃত্ব গুণ অনুশীলন ও অর্জনের সময় দলগত রাজনৈতিক ক্রীয়াশীলতার সময় নয়। শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে জ্ঞানবৃদ্ধি ও ব্যক্তিদের বিকাশ ঘটিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নীতি-আদর্শের তুলনামূলক বিচার সাপেক্ষে পছন্দের দলে নিজের অন্তর্ভুক্তি কাম্য। এ ধরনের ছাত্র নেতা রাজনৈতিক দলকে সমৃদ্ধ করেন। অপরদিকে, ছাত্রাবস্থায় যারা রাজনৈতিক দলের ক্রীড়নকে পরিণত হয়, তারা ভবিষ্যত জীবনে কখনো সৎ ও দৃঢ় চরিত্রের অধিকারী হতে পারে না। দুর্নীতি দিয়ে যার হাতেখড়ি, সে ভবিষ্যতে চরম দুর্নীতিগ্রস্ত ও দুরাচারী হবে, এটি স্বাভাবিক। এটি যে বর্তমানে আমাদের দেশে রাজনৈতিক অবক্ষয় ও দেউলিয়াপনার এক প্রধান কারণ, তা-ও বলাবাহুল্য। বর্তমানে এ দেশের গরিষ্ঠ সংখ্যক রাজনৈতিক দল বা নেতার চরিত্রে অনুকরণযোগ্য আদর্শের দৈন্যদশা চরমে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের চারিত্রিক চরম অবক্ষয় ও ক্রমবর্ধমান শৃঙ্খলাহীনতার প্রতিচ্ছবির বহিঃপ্রকাশ সংসদ থেকে শুরু করে সর্বত্র অতি নগ্নরূপে দৃষ্ট হচ্ছে। এরূপ দলনেতার সংস্রবমুক্ত থাকা ছাত্র সমাজের জন্য কল্যাণকর। ছাত্রস্বার্থ তথা বৃহত্তর শিক্ষার স্বার্থে ছাত্র রাজনীতিকে দলীয় রাজনীতির কবলমুক্ত করার প্রয়াস ও তৎপরতা সা¤প্রতিককালে এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। ছাত্র রাজনীতির শুদ্ধীকরণে অগ্রণী ভূমিকা পালনে ভারতের কেরালা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য। এ বিশ্ববিদ্যালয় কয়েক বছর পূর্বে এ মর্মে কিছু সদর্থক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইউনিয়নের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা ‘ক্লাস টপার’ বা ‘ফার্স্টবয়’ হবেন; শিক্ষা-সঙ্গীত-খেলাধুলা ও মেধা বিকাশের অন্যান্য বিষয়ে উৎকর্ষ সাধনের প্রয়াস হবে ইউনিয়নের কাজকর্মের বিষয়; দলীয় রাজনীতির হানিকর সংক্রমণ থেকে ইউনিয়নের কাজকর্মকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে হবে ইত্যাদি। অবশ্য এরূপ নির্দেশিকাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনধিকার চর্চা ও অন্যায় ‘ফতোয়া’ আখ্যা দিয়ে বিষয়টি মামলা আকারে সুপ্রিমকোর্টে নীত হয়। মহামান্য সুপ্রিমকোর্ট বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেন এবং এ সম্পর্কিত যাবতীয় বিষয় খতিয়ে দেখে পরামর্শ প্রদানের জন্য একটি কমিটি গঠনের আবশ্যকতা অনুভব করেন। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউনিয়ন নির্বাচনে অর্থ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশীশক্তির দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ করতে কমিটি গাইডলাইন তৈরি করবে যেখানে বিবেচ্য বিষয়ের মধ্যে থাকবে: নির্বাচনে প্রার্থী হতে গেলে আবশ্যকীয় যোগ্যতা: কী কী কারণে একজন ছাত্র নির্বাচনে প্রচারকার্যে খরচের সর্বোচ্চ পরিমাণ ও তার উৎস; রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ মদতপুষ্ট ছাত্রছাত্রীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করা ইত্যাদি। এ বিষয় সুপ্রিমকোর্ট বলেছে ‘We have to fix some eligibility criteria for student candidates. It is found that some student leaders go on staying in the same institution not for studies but for some other political reasons.’ উল্লেখ্য, সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশানুসারে ভারতের মানবসম্পদ বিকাশ মন্ত্রণালয় অবসৃত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জেএম লিংডো-র নেতৃত্বে এক কমিটি গঠন করে। ছাত্র ইউনিয়ন নির্বাচনের যাবতীয় দিক পর্যালোচনা করে লিংডো কমিটি যে রিপোর্ট জমা করে তার সুপারিশগুলো সুপ্রিমকোর্টের স্বীকৃতি লাভ করে। সুপ্রিমকোর্ট ২২ সেপ্টেম্বর ২০০৬ ইংরেজির এক আদেশে এ সুপারিশগুলোর সত্বর বাস্তবায়নের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারকে নির্দেশ দেন। লিংডো কমিটির সুপারিশগুলোর মধ্যে প্রধান কিছু এখানে উল্লেখ করা হলো: ১) ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচন এবং ইউনিয়নে প্রতিনিধিত্ব সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিক দল-নিরপেক্ষ হতে হবে। ২) কলেজস্তরে ১৭ থেকে ২২ বছর বয়সসীমার মধ্যকার ছাত্রছাত্রী নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করতে পারবেন। ৩) নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করার বছরে প্রার্থীর কোনো ‘অ্যাকাডেমিক এরিয়ার’ থাকতে পারবে না অর্থাৎ পূর্ববর্তী পাঠক্রম সফলভাবে সম্পূর্ণ করে আসা ছাত্রছাত্রীরা নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করার জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন। ৪) প্রতিদ্ব›িদ্বতায় ইচ্ছুক ছাত্রের ক্লাসে উপস্থিতির হার বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত হার অথবা পঁচাত্তর শতাংশের মধ্যে যেটা অধিক সেটা হতে হবে। ৫) অতীতে যে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত ছাত্রছাত্রী নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতার ক্ষেত্রে অযোগ্য বিবেচিত হবেন। ৬) শুধুমাত্র কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ও পূর্ণকালীন ছাত্রছাত্রী ইউনিয়ন নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করতে পারবেন। ৭) ইউনিয়ন নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতাকারী প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের পরিমাণ নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকতে হবে। ৮) নির্বাচনী প্রচারে কোনো ধরনের ছাপা পোস্টার, ব্যানার ইত্যাদির ব্যবহার তথা জনসভা নিষিদ্ধ। শুধুমাত্র হাতে লেখা পোস্টারের সীমিত ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রিত প্লাটফর্ম লেকচার অনুমোদনযোগ্য। ৯) পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া দশ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। ছাত্র রাজনীতি নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার সময় এসেছে আমাদেরও। আমাদের প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। তাদেরকে একটি সুন্দর নিয়ম শৃঙ্খলার ভিতর দিয়ে পরিচালিত করতে হবে। গঠনমূলক কাজে তাদেরকে উৎসাহ উদ্দীপনা দিতে হবে। তাদের মেধার বিকাশ ঘটাতে হবে। সব সময়ই সুপরামর্শ দিয়ে তাদের লালন করতে হবে। দলীয় রাজনীতির মোহ থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের কল্যাণার্থে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে মনোনিবেশে সহায়ক ভূমিকা রাখতে হবে। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট