Responsive Ads for Rent
Showing posts with label প্রথম আলো. Show all posts
Showing posts with label প্রথম আলো. Show all posts

Friday, 11 October 2019

উপাচার্যকে বিদায় নিতে হবে, বুয়েট পরিস্থিতি।

সরকারপন্থী ছাত্রলীগের অনুগত নয় এমন যেকোনো শিক্ষার্থী যেকোনো কারণে নির্যাতনের শিকার হতে পারেন, এমনকি আবরারের মতো প্রাণও হারাতে পারেন—এই ব্যবস্থা এক দিনে গড়ে ওঠেনি; দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য ও আবাসিক হলগুলোর প্রাধ্যক্ষরাসহ পুরো প্রশাসনের জ্ঞাতসারেই তা ঘটেছে। প্রশাসনিক পদে নেই এমন শিক্ষকেরাও এই নিষ্ঠুর ব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত আছেন। এই নির্যাতনব্যবস্থা এতটাই জবরদস্ত যে এর কাছে দেশের আইনকানুন ও থানা-পুলিশও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। রোববার রাতে শেরেবাংলা হলে যখন আবরারকে নির্যাতন করা হচ্ছিল, তখন খবর পেয়ে চকবাজার থানার একজন উপপরিদর্শক তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে শেরেবাংলা হলের গেটে গিয়েছিলেন। ছাত্রলীগের বাধা পেয়ে পুলিশ কর্মকর্তা সেখানে এক ঘণ্টা বসে থাকার পর ফিরে যান। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও আইন প্রয়োগের ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দিয়ে যে নির্যাতনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা কীভাবে ও কিসের জোরে গড়ে উঠতে পেরেছে, তা একটা গভীর প্রশ্ন।শুধু তা-ই নয়, শেরেবাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ, যিনি ওই ছাত্রাবাসের বাসিন্দা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাসহ সব রকমের দেখভাল করার দায়িত্বে নিয়োজিত, তিনিও তাঁর একদল শিক্ষার্থীর নৃশংস আক্রমণের হাত থেকে আরেক শিক্ষার্থীর জীবন রক্ষার জন্য কোনো ভূমিকাই পালন করেননি। আর প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় অভিভাবক, উপাচার্য সাইফুল ইসলাম আবরার হত্যার পর দীর্ঘ সময় ধরে ক্যাম্পাসে হাজির হওয়া থেকে বিরত ছিলেন। এত বড় মর্মান্তিক ঘটনায় উপাচার্য হিসেবে তাঁর তরফে যে নূ্যনতম সংবেদনশীলতার প্রকাশ প্রত্যাশিত ছিল, তার দৃশ্যমান অভাব শিক্ষার্থীদের সংগতভাবেই ক্ষুব্ধ ও হতাশ করেছে।

বুয়েটে সরকারপন্থী ছাত্রসংগঠনের নিষ্ঠুর দুর্বৃত্তপনার যে স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, উপাচার্যসহ পুরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে তার দায় নিতে হবে। এই নির্যাতনব্যবস্থা স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করার উদ্যোগ নেওয়া একান্ত জরুরি। শিক্ষার্থীরা যে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন, তার অন্যতম হলো আবাসিক হলগুলোতে র‍্যাগিংয়ের নামে ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনসহ সব ধরনের নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। বুয়েট শিক্ষক সমিতি অদক্ষতা ও নির্লিপ্ততার অভিযোগে উপাচার্য সাইফুল ইসলামের পদত্যাগ দাবি করেছে, বুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনও উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেছে। একই সঙ্গে এই সব পক্ষের তরফেই বুয়েটে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে।

বুয়েটে চলমান অস্থির পরিস্থিতির দ্রুত অবসান ঘটিয়ে পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। সে জন্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। সেখানে সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম ও দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা নির্যাতন ও র‌্যাগিংয়ের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। বুয়েটের বর্তমান প্রশাসনের মাধ্যমে যে এটা সম্ভব হবে না, তা পরিষ্কার। উপাচার্য সাইফুল ইসলামকে তাই পদত্যাগ করতে হবে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ ও অযোগ্য হল প্রাধ্যক্ষদেরও সরে যেতে হবে। বুয়েট নিয়ে সব পক্ষের মধ্যে যে উপলব্ধি হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে সবকিছু নতুনভাবে শুরু করার উদ্যোগ নিতে হবে।

ছাত্ররাজনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবুন, অনিরাপদ শিক্ষাঙ্গন।

বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের খুনিরা চিহ্নিত হয়েছেন, বেশির ভাগ অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন। আইন নিজের মতো চললে সবাইকে গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হবে। কিন্তু আইন নিজের মতো চলবে বা খুনিরা সত্যি সত্যি শাস্তি পাবেন—এ ব্যাপারে সন্দেহমুক্ত থাকা যাচ্ছে না। গতকালের প্রথম আলোর খবর থেকে জানা যায়, গত ১০ বছরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ জন এবং সিলেটের শাহজালাল, লিডিং ও সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে একজন করে মোট ১৫ জন শিক্ষার্থী খুন হয়েছেন; কিন্তু একটি হত্যাকাণ্ডেরও বিচার হয়নি।

আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে শিক্ষাঙ্গনে আন্দোলন-বিক্ষোভ চলছে। বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখে তাঁদের মানসিক অবস্থা অনুধাবন করা কঠিন নয়। আবরারের অনেক সহপাঠী মিছিলে এসে, কথা বলতে গিয়ে কেঁদেছেন। কিন্তু তঁাদের এ কান্না কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে কি না, সেটা এক বড় প্রশ্ন। মন্ত্রী-নেতারা কোন আমলে কতটি খুন হয়েছে, কতটির বিচার হয়েছে কি হয়নি, তা নিয়ে অহেতুক বিতর্ক করছেন। এর মধ্যে দায় এড়ানোর প্রবণতা যেমন আছে, তেমনি ছাত্ররাজনীতির নামে শিক্ষাঙ্গনে যা চলছে, তার প্রতি সমর্থনই প্রকাশ পাচ্ছে।বুয়েটের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা যে ১০ দফা দাবি পেশ করেছেন, তাতে আবরার হত্যার খুনিদের বিচারের দাবি রয়েছে। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে খুনের বিচার হতেই হবে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা শিক্ষাঙ্গনে যে সন্ত্রাস ও নিরাপত্তাহীনতার চিত্র তুলে ধরেছেন, তা ভয়াবহ। রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে আবাসিক হলে ত্রাসের রাজনীতি কায়েম করা, নবীন শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, র‌্যাগিং, রাজনৈতিক সভা-মিছিলে যোগ দিতে বাধ্য করা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ ছাত্রদের ওপর নির্যাতন চালানো ও হল থেকে বিতাড়িত করার ঘটনায় তাঁরা বিক্ষুব্ধ।

২০০২ সালে বিএনপি সরকারের আমলে ছাত্রদলের দুই পক্ষের গোলাগুলিতে সাবিকুন নাহার ওরফে সনি নামের এক শিক্ষার্থীকে জীবন দিতে হয়। আর আওয়ামী লীগ আমলে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা পিটিয়ে হত্যা করলেন আবরারকে। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীরা ১৫ অক্টোবরের মধ্যে বুয়েটে সব রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার যে দাবি তুলেছেন, তাকে অযৌক্তিক বলা যাবে না। আবরার হত্যার প্রতিবাদে মাঠে নেমেছেন বুয়েটের শিক্ষকেরাও। গতকাল শিক্ষক সমিতি উপাচার্যের পদত্যাগের পাশাপাশি দলীয় পরিচয়ে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে।

রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তির যে ছাত্ররাজনীতি ভিন্নমতের কারণে আরেকজন ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার পরিস্থিতি তৈরি করে বা যে ছাত্ররাজনীতি আবাসিক হলে নির্যাতন সেল তৈরি করে, সেই ছাত্ররাজনীতি চলতে পারে না। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের চাওয়া ও দাবি বিবেচনায় নিয়ে বুয়েট এবং এ ধরনের বিশেষায়িত সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর চারটি বিশ্ববিদ্যালয়কে (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়) বহু আলোচিত ’৭৩–এর বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসন আইনের অধীনে নেওয়া হলেও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) নেওয়া হয়নি। ফলে এটি এখনো পরিচালিত হচ্ছে ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী। একইভাবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ও (বাকৃবি) চলছে নিজস্ব আইনে। এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষায়িত বলেই সম্ভবত সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত অন্য কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ’৭৩–এর আইনের আওতায় আনা হয়নি। এসব বিবেচনায় বিশেষায়িত সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় পরিচয় ও প্রচলিত ছাত্রসংগঠনভিত্তিক ছাত্ররাজনীতিমুক্ত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আমরা আশা করছি, বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এ ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।