Responsive Ads for Rent
Showing posts with label বাংলা. Show all posts
Showing posts with label বাংলা. Show all posts

Saturday, 12 October 2019

আবরার ও রাষ্ট্রের বিবেক

 
 সাহাব এনাম খান
‘আবরার’– এই নামটি এখন আর কোনও সাধারণ নাম নয়। আবরারকে বর্তমান সময়ের বাংলাদেশের রূঢ়, ক্ষয়িষ্ণু সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতীকী নাম হিসেবেই আমি দেখি। আবরারের মৃত্যু আমাদের বিস্মিত করে না, শুধু মনে করিয়ে দেয় আমাদের সৃষ্টি করা অমানবিক, অসহিষ্ণু সমাজের কথা। আবরারের মৃত্যুতে তার পিতামাতার বেদনার কিছুটা হয়তো বা তার সহপাঠী, বন্ধু, আর শিক্ষকরা অনুভব করতে পারবেন, এর বাইরে যারা তার মৃত্যুর জন্য দায়ী এবং সেই দায়ী ব্যক্তিদের যারা পৃষ্ঠপোষক তারা কিছু অনুভব করেন কিনা আমার জানা নেই। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, তারাই এই রাষ্ট্রের মানবিক মূল্যবোধকে নিয়ন্ত্রণ করেন। একজন শিক্ষক হিসেবে তার মৃত্যু আমাকেও স্পর্শ করে এবং এ মৃত্যুর দায় আমার মতে কোনও শিক্ষকই এড়িয়ে যেতে পারেন না।
A
A
আবরার হয়তো একদিন বড় প্রকৌশলী হতে পারতো, হয়তো বা সরকারের বড় পদস্থ হতে পারতো, হয়তো বা শুধু একজন ভালো মানুষ হিসেবেই সমাজ গঠনে ভূমিকা রেখে যেত। ফেসবুকে তার বাংলাদেশ-ভারতকে নিয়ে চিন্তা আমাদের যুবসমাজের মুক্তচিন্তাভিত্তিক গণতন্ত্রের প্রতি আগ্রহরই প্রকাশ। এত অল্প বয়সে রাষ্ট্রের নীতি নিয়ে তার চিন্তার বিস্তার আমাদের মুগ্ধ করেছে। তার মতের সঙ্গে সবার মিল থাকতে হবে এমন কোনও আইন বা সাংবিধানিক বাধা রাষ্ট্র দেয় না। তার হত্যাকারীরা হয়তো বাকিদের বাকস্বাধীনতা রোধের ইঙ্গিত দিতে চেয়েছে। এটি সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতি ও সন্ত্রাসবিরোধী বর্তমান অবস্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার শামিল। আমি মনে করিয়ে দিতে চাই, প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষ যত ওপরে ওঠে, তত ভদ্র হতে হয়, হাম্বল হতে হয়। আর আমাদের হয় উল্টোটা। এটা হয় তখনই, যখন হঠাৎ করে পয়সার জোরে নিচ থেকে অনেক ওপরে যায়, তখন তারা ভাবে ‘মুই কী হনুরে’। সমাজের এই জায়গাটায় একটি আঘাত দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। অসৎ উপায়ে অর্জিত অর্থের বাহাদুরি, সে সম্পদের শো-অফ করা, আর যারা সৎপথে চলবে, তারা একেবারে মরে থাকবে, এটা তো হতে পারে না।’
A
তবে এটা পরিষ্কার, আমি যে সমাজে বসবাস করি এবং যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ, সেই সমাজ বা রাজনীতি আবরারের মৃত্যুতে যে অপূরণীয় ক্ষতি হলো তা পূরণ করার ক্ষমতা রাখে না। তোষামোদকারী ছাড়া কারোরই এই বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই বিষয়টিকে অযথা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে ভিন্নখাতে নিয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই।
A
বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ১৯৫২ সাল থেকে শুরু করে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। ছাত্র আন্দোলনগুলোতে তো সর্বসাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দিয়েছিলেন, তাই সাধারণ মানুষ-ই ছাত্র নেতৃত্বকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন। ভেবে দেখার সময় এসেছে আদতে সাধারণ মানুষ এই ছাত্র রাজনীতিতে কতটুকু ভরসা রাখেন এবং পিতামাতা যারা তাদের সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াতে পাঠান তারা কতটুকু নিশ্চিন্ত থাকেন। তাছাড়া তৎকালীন সময়ে অসাধারণ মেধাবী শিক্ষকরা যথাযথ জ্ঞান বিতরণ ও শিক্ষার পরিবেশের মাধ্যমে এই আন্দোলনগুলোর জন্য যোগ্য নেতৃত্ব এবং মেধাবী কর্মী তৈরি করে দিয়েছিলেন। এর সুফল এই জাতি পেয়েছে।
A
দুর্ভাগ্যজনক হলেও, নব্বইয়ের দশকের পরবর্তীতে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখার মতো গঠনমূলক কাজের উদাহরণ সাংগঠনিক দলগুলো দিতে পারবে কিনা তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। যোগ্যতাসম্পন্ন ছাত্রকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অঙ্গসংগঠনগুলোর নৈতিক অবক্ষয় এবং এর প্রাসঙ্গিকতার অভাব বাংলাদেশের মানুষ অনেক দিন ধরেই অনুভব করছেন। তাই, ছাত্রলীগ বা যুবলীগের মতো ঐতিহাসিক অঙ্গসংগঠনগুলোর ‘সন্ত্রাসী প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে আখ্যা পাওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ইতিহাসের পাতায় শুধু কালো আর লাল কালির দাগই পাওয়া এখন যায়।
A
২০০২ সালে শামসুন্নাহার হলে পুলিশি হামলার ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। অধ্যাপক চৌধুরীর পদত্যাগের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থীদের সমাগম ঘটে। ২০১২ সালে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, ছাত্রলীগের অঞ্চলভিত্তিক অংশকে মদত, বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার অভিযোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সে সময়ে ছাত্রলীগ নেতাদের হামলায় সংগঠনটির অন্য অংশের কর্মী ইংরেজি বিভাগের ছাত্র জুবায়ের আহমেদ নিহত হওয়ার পরে এর বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে। ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল সাধারণ ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ জনগণের এক অভূতপূর্ব সম্মিলনে। এই আন্দোলনের মধ্যে যখন বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক স্বার্থবাদী কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন ঘটা শুরু করে তখন এই আন্দোলনটি নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্নও তৈরি করে।
A
নিরাপদ সড়কের জন্য যৌক্তিক আন্দোলন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভ্যাটের বিরুদ্ধে আন্দোলন, অথবা কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রত্যেকটিতেই ছিল সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণ। সাংগঠনিক রাজনীতির যথার্থ ভূমিকা এখানে খুঁজে পাওয়াটা দুষ্কর। এসব আন্দোলন এতটাই সরল ছিল, যা শুধুমাত্র রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলা যেত। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, এখানে বল প্রয়োগ করার মতো অবস্থায় না নিয়ে যাওয়ার মতো রাজনৈতিক দূরদর্শিতা বা প্রশাসনিক দক্ষতা কি ছিল না?
A
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে জুবায়েরের মৃত্যুতে আমাদের রাজনৈতিক চেতনায় যেমন কিছুই শিখিনি তেমনি বাংলাদেশের গর্ব বুয়েটের ছাত্র আবরারের মৃত্যু থেকেও আমাদের রাজনৈতিক চেতনায় খুব বেশি পরিবর্তন আসবে বলে আশা করি না। নিশ্চিতভাবেই এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অনেক জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, উপদেশ বাণী, ব্যাপক পরিবর্তনের আশ্বাস, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্গতিতে অতীতে কার কী ভূমিকা ছিল, এমনকি যারা এ ধরনের রাজনীতিকে সমর্থন দিয়ে আসছেন তাদের কাছ থেকেও বিস্তর আশার কথা আমরা শুনবো। এতে মূল অবস্থার পরিবর্তন হবে না, তবে কিছু কসমেটিক লেভেলের আইনি এবং এডহক রাজনৈতিক সমাধান আমরা দেখবো। এর মানে হলো, শিক্ষাঙ্গনে পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক রিফর্ম এবং ছাত্র রাজনীতির ব্যাপক সংস্কার করার মতো টেকসই রাজনৈতিক পরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার প্রতিফলন ঘটানোর মতো প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক নিষ্ঠার অভাব আছে।
A
জনগণের ট্যাক্সের টাকায় যাদের আইন প্রয়োগ এবং প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় তারা আদতে প্রধানমন্ত্রীকে কতটুকু বাস্তবসম্মত সহায়তা করেন তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। প্রতিটি সাধারণ নাগরিক বিষয়েই যদি সরকারের সর্বোচ্চ ব্যক্তির এবং রাষ্ট্রের হাইকোর্টের নির্দেশনার প্রয়োজন হয় তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজনীতিবিদ বা সরকারি কর্মচারীদের যোগ্যতা ও নিষ্ঠা নিয়ে ভেবে দেখা দরকার। দুই জন ছাত্রলীগ নেতার অপসারণ যে যথেষ্ট নয় তা আবরারের মৃত্যুই প্রমাণ করে।
A
যুবলীগ সভাপতির বয়স পত্রপত্রিকা অনুযায়ী ৭০-এর ওপরে এবং তাদের অনৈতিক কার্যক্রমের পরিধি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অনেক প্রবীণ রাজনীতিবিদকে হতাশ এবং বিস্মিত করেছে। এর পেছনে মূলত দুটি কারণ দায়ী। প্রথমটি হলো তোষামোদ, অনৈতিক আর্থিক সুবিধা আদায় ও বল প্রয়োগের রাজনীতি। তোষামোদি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় দুর্বলতার জায়গা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি অনেকটাই তোষামোদ কেন্দ্রিক। এর সাথে যুক্ত হয়েছে কিছু আনুগত্যপ্রবণ ‘বুদ্ধিজীবী’ ও ‘মিডিয়া’ শ্রেণি, যারা বিভিন্নভাবে কলুষিত ছাত্র রাজনীতিকে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ মদত দিয়ে আসছেন। এটা আরও ভয়ঙ্কর। এরা ভুলকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণকে বিভ্রান্ত করেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই সত্য গোপন করেন। এটাকে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি বলা যায়।
A
দ্বিতীয়টি হলো রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যবহারের নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় ভোট ব্যাংক তৈরি করার জন্য অনেক সময় শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া হয়, এবং হালে তো আমরা দেখছিই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনগুলোর কার্যকলাপের নমুনা। এদের কার্যকলাপের সঙ্গে বা নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংখ্যাগুরু শিক্ষক কোনও অবস্থাতেই যুক্ত থাকেন না। এই ভোট ব্যাংকের উদ্দেশ্যটাই হলো যৌক্তিক ছাত্র আন্দোলনকে বা শিক্ষকদের ডিসেন্ট দেওয়ার ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করা। অতীত ইতিহাসে সরকার পরিবর্তন, রাজনৈতিক মেরুকরণ, বলাই বাহুল্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মতো মহান কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অসামান্য ভূমিকা যেকোনও রাজনৈতিক দলের জন্যই নব্বই পরবর্তী দশকে হুমকি হিসেবে দেখা দেয়। ফলে, একশ্রেণির শিক্ষক দুর্নীতি এবং ক্ষমতাপরায়ণ আমলা-রাজনীতিবিদের সাথে যুক্ত হয়ে দুষ্টুচক্র সৃষ্টি করেন। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিষয়টিকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। জুবায়ের এবং আবরারের মৃত্যু দুষ্টচক্রের কার্যকলাপেরই ছোট একটি উদাহরণ মাত্র।
A
অতি উৎসাহী দলীয়করণে সাময়িকভাবে কোনও একটি দল হয়তো বা লাভবান হয় কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সরকার বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে, রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থার অভাব ঘটে, এবং সিভিল ও সামাজিক আনরেস্টের দিকে সমাজ ধাবিত হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি অনুধাবন করেছেন বলেই ব্যাপক আকারে শুদ্ধি অভিযান বাংলাদেশে চলছে। বাংলাদেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজ, টকশোতে দলীয় তোষামোদকারীদেরও এ শুদ্ধি প্রক্রিয়ার আওতায় আনা উচিত। গঠনমূলক সমালোচনা সকলের জন্যই মঙ্গল কিন্তু বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং যুক্তি অমঙ্গলই ঘটায়।
A
ওপরের দুটো বিষয়ই বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির অগ্রগতির গতি-প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়াকে ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত করে। যে পর্যন্ত বাংলাদেশের মূল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শুদ্ধি অভিযান সম্পূর্ণ না হবে এবং তোষামোদ ও শক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে মেধাভিত্তিক রাজনীতির প্রবর্তন না হবে, সে পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতি নিয়ে আশান্বিত হওয়ার কিছু নেই। বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাজনীতির বাইরে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতির পরিবেশ আরও বেদনাবহ।
A
এই বাস্তবতায় দুটি বিকল্প চিন্তা পাবলিক প্ল্যাটফর্মে আলোচনা করা যেতে পারে। প্রথমটি হলো, বুয়েটের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করা। কারণ, বুয়েটের শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক পরিবর্তন ও সাংগঠনিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছেন। বুয়েটের মতোই অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও হলে হলে ত্রাসের রাজনীতি কায়েম করে রাখা হয়। তাই বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে প্রধানমন্ত্রীর শুরু করা শুদ্ধি অভিযান চলাকালে সাংগঠনিক লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা শ্রেয়। বিএনপি-জামায়াত বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো এই সুযোগে হল ও বিশ্ববিদ্যালয় দখল করবে, অতীতে ছাত্রলীগ মার খেয়েছে ইত্যাদি অতি ব্যবহৃত যুক্তিগুলোর সামাজিক আপিল অনেক আগেই হ্রাস পেয়েছে। অথবা ১৫ বছর আগের বিএনপি যে নির্যাতন করেছিল তা নিয়ে তুলনা করে যুক্তি দেওয়া হয়। বিএনপি বা শিবির সন্ত্রাস করেছিল বলেই ২০০৮ সালে মানুষ এই সরকারকে নির্বাচিত করে। ছাত্রলীগ বিএনপি বা শিবির যা করেছিল সেটার পুনরাবৃত্তি করবে সেই ম্যান্ডেট মানুষ সরকারকে দেয়নি। এটা মনে রাখা দরকার।
A
রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের জনগণ উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে বর্জন করেছে এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের অবস্থান সুস্পষ্টভাবেই দুর্বল। এহেন বাস্তবতায় অচল যুক্তি দিয়ে সন্ত্রাসকে পরোক্ষ প্রশ্রয় দেওয়ার অপচেষ্টা ও সাধারণ মানুষকে বিরক্ত করার প্রবণতা বন্ধ করা প্রয়োজন। এ ধরনের যুক্তি সাধারণ মানুষের সাধারণ বোধকে আহত করে। বরং অনেক গবেষণায় দেখা গেছে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং মত প্রকাশের বাধা যুব সমাজের একটি অংশকে ধর্মীয় উগ্রবাদের দিকে ঠেলে দেয়। যারা রেডিক্যালাইজেশন বা এক্সট্রিমিজম বা ক্রিমিনাল সাইকোলজি নিয়ে কাজ করেন তারা বলতে পারবেন রাজনৈতিক নিগ্রহ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে আতঙ্কজনক পরিবেশের কারণে অনেক শিক্ষার্থীই উগ্রপন্থী মতাদর্শে বা বিকল্প আদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
A
সাংগঠনিক রাজনীতি যদি উগ্রবাদের পরিবেশকে তৈরি করে দেয় তাহলে রাজনৈতিক উন্নয়ন হবে কী করে? বিষয়টা সরাসরি সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত। র্যাাব বা সিটিটিসিইউ’র সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানগুলোতে যেসব যুবক আটক হয়েছে বা যারা সম্পৃক্ত বলে ধারণা করা হয় তাদের অনেকেই শিক্ষিত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, জুডিশিয়ারি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে যোগ্য মানবসম্পদের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলে এ ধরনের অনেক সমস্যার সমাধান হবে।
A
দ্বিতীয় বিকল্পটি হলো, সাংগঠনিক রাজনীতির ওপর থেকে সরাসরি দলীয় সহায়তা তুলে নিয়ে তাদের সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক নৈতিক রাজনীতি করার পথ করে দেওয়া। একই সঙ্গে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের রাজনৈতিক ভাবনা ও মত প্রকাশের স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেওয়া দরকার। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন ও মিডিয়াকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। পুরনো ধ্যান-ধারণা থেকে বের হয়ে এসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো এবং ছাত্রছাত্রীদের নির্ভীকভাবে মুক্ত রাজনৈতিক চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করার জন্য উন্মুক্ত রাজনীতির ব্যবস্থা বেশি কার্যকর হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে শুধু মেধাভিত্তিক শিক্ষকদের সহায়তায় এই ব্যবস্থাটি করা প্রয়োজন।
A
শিক্ষার্থীরা কোন দলকে এবং নীতিকে ধারণ করবেন সেটা তাদের ওপরেই ছেড়ে দেওয়া ভালো। জোর করে অর্পণ করা আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়ায়। এটাই আমরা দেখছি। এখানে উল্লেখ্য, আবরারের মৃত্যুর সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সম্পর্ক ও জাতীয় স্বার্থও জড়িয়ে গেছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা এটা কখনও দেখিনি। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের অতি সাধারণ দাবিগুলোর মধ্যে আমরা আমাদের অযোগ্যতা ঢাকার ও স্বার্থরক্ষার জন্য ষড়যন্ত্রের মন্ত্র খুঁজে বেড়াই। এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সংস্কৃতি থেকে বের আসার সময় এখন। ষড়যন্ত্রের মন্ত্র না খুঁজে বরং বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী বা শিক্ষকদের দাবির ওপর আস্থা রাখা দরকার। কারণ, এদের বেশিরভাগই দেশের সেরা মেধাবী সন্তান। তাই বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তচিন্তার জায়গা করে দেয়া এখন সময়ের প্রয়োজন। এ বিষয়টি আমরা যত তাড়াতাড়ি অনুধাবন করবো ততই মঙ্গল। অন্যথায় আমি মোমবাতি হাতে শুধু অন্ধকার দেখি।
A
লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

কাঠগড়ায় রাজনীতি!


  রেজানুর রহমান
সারাদেশে এখন একটাই খবর—সম্রাট গ্রেফতার হয়েছেন। স্বস্তিকর খবর হলো—সম্রাটেরাও শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার হন। সম্রাট। নামের মতো প্রভাব-প্রতিপত্তিতেও তিনি সম্রাট ছিলেন। গ্রেফতারের পর সম্রাটকে ঘিরে যে ধরনের কেচ্ছা-কাহিনি প্রকাশ হচ্ছে, তা যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। তিনি করেছেন রাজনীতি। কিন্তু সেটা ছিল তার প্রভাব-প্রতিপত্তি গড়ে তোলার পাশাপাশি অন্ধকার জগতের সম্রাট হওয়ার একমাত্র খুঁটি। রাজনীতিকে তিনি অন্যায় ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করেছেন। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, শুধু সম্রাটই নন, রাজনীতিকে আরও অনেকেই স্রেফ ব্যবসা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি গড়ে তোলার বাহন হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং এখনও করছেন। এমন আরও তথ্য হয়তো মিলবে। যে কারণে ‘রাজনীতি’ শব্দটিই যেন এখন কাঠগড়ার অপরাধী। অথচ এই রাজনীতিই প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল।
A
প্রিয় পাঠক, একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, মারাত্মক অপরাধ এমনকি খুন করার পরও যদি কেউ গ্রেফতার হন, তাকে বা তাদের নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য পরিবারের লোকেরা উঠেপড়ে লেগে যান। শ্রদ্ধাভাজন আইনজীবীদের মধ্যেও অনেকে অপরাধীর পক্ষেই সাফাই গাইতে শুরু করেন। আইনের মারপ্যাঁচে পড়ে খুনের মামলার আসামিও অনেক সময় বেকসুর খালাস পেয়ে যায়।
এই প্রথম দেখলাম একজন অপরাধীর পরিবারেরই একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য অপরাধীর সাজা চেয়েছেন। সম্রাটের দ্বিতীয় স্ত্রী শারমিন বলেছেন, ‘আমার স্বামী যদি অপরাধ করে থাকে তাহলে তার সাজা হওয়া উচিত। প্রসঙ্গক্রমে শারমিন বলেছেন, এখন যুগ পাল্টেছে। বিনে পয়সায় এখন আর কেউ মিছিলে আসে না। সম্রাট যা আয় করতো, তার একটা বড় অংশ মিছিলে লোক আনার জন্য খরচ করতো।’
শারমিন চৌধুরীর এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে অনেকে হয়তো সম্রাটের প্রতি অনুকম্পা দেখাতে চাইবেন। এক্ষেত্রে নানাজনের নানান মত থাকতেই পারে। কিন্তু একথা তো সত্য, সম্রাট রাজনীতিকে তার স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। একসময় হয়তো মিছিল মিটিংয়ে লোক জড়ো করেই দলের নেতাদের সুনজরে পড়ে যান এবং এই ‘সুনজরকেই’ পুঁজি বানিয়ে আজকের সম্রাটে পরিণত হন। শুধু সম্রাটই নন, মিছিল-মিটিংয়ে বেশি বেশি লোক আনতে পারার যোগ্যতায় আজ অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে গেছেন। যদিও এখন আর সেই সুযোগ নেই। কারণ দেশে এখন আর মিছিল মিটিংয়ের তেমন একটা দরকার পড়ে না।
প্রিয় পাঠক, একটা চমকপ্রদ তথ্য দেই আপনাদের। আপনি সভা অথবা সেমিনার করবেন। দর্শক দরকার? ফেল কড়ি মাখো তেল। টাকা দিলেই দর্শক পেয়ে যাবেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তায় প্রতিদিন কোনও না কোনও রাজনৈতিক দল অথবা সংগঠনের সভা-সমাবেশ লেগেই থাকে। হাততালি দেওয়ার জন্য লোক দরকার? চিন্তার কোনও কারণ নেই। প্রেস ক্লাবের সামনে গেলেই উপযুক্ত লোক পেয়ে যাবেন। শুধু আওয়াজ দেবেন, অডিয়েন্স চাই। দেখবেন একসঙ্গে একাধিক ব্যক্তি এসে হাজির হবেন। শুধু বলবেন আপনার কতজন অডিয়েন্স দরকার। অবশ্য সভা-সমাবেশের আকার-প্রকারভেদে জনপ্রতি অডিয়েন্সের ভাড়া নির্ধারিত হয়। রাস্তার সমাবেশের ভাড়া এক ধরনের। সেমিনারে যোগ দেওয়ার ভাড়া অন্য ধরনের। আর যদি সেমিনারে খাবারের প্যাকেট পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে, তাহলে জনপ্রতি ভাড়ার পরিমাণ কমে যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ‘জোগানদার’ বললেন, “এখন আর সেই দিন নেই। দেশের পরিস্থিতি ভালো। তাই এখন আর তেমন মিছিল মিটিং হয় না। একপর্যায়ে গর্বের ভঙ্গিতে বললেন, এখন যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বড় বড় নেতা তাদের অনেককেই আমি ‘অডিয়েন্স’ সাপ্লাই দিছি। মিছিল মিটিংয়ে লোক ভাড়া কইর্যা আনছি। এখনও মাঝে মাঝে অনেক নেতা আমার কাছে সংবাদ পাঠায়। মিছিল মিটিংয়ের জন্য ‘অডিয়েন্স’ চায়। সাধ্যমতো জোগাড় কইর্যা দেই। তবে মানুষ এখন অনেক চালাক হইয়া গেছে। সরকারি দলের মিছিল মিটিং হইলে ভাড়া বেশি চায়।”
জোগানদার পরিচয়ের এই লোকটিকে প্রশ্ন করেছিলাম, মিছিল মিটিংয়ে লোক ভাড়া করতে হয় কেন? দলকে যারা ভালোবাসে তারা তো এমনিতেই মিছিল মিটিংয়ে আসার কথা। তারা কি আসে না?
জোগানদার লোকটি মৃদু হেসে বলল, “সেই দিন আর এখন নাই। টাকা ছাড়া কেউ এক পাও আগায় না। ভাই, ছোট মুখে একটা বড় কথা বলি। এখন অনেকেই আদর্শের জন্য রাজনীতি করে না। পাওয়ারের জন্য রাজনীতি করে। আপনার রাজনৈতিক পাওয়ার আছে। চিন্তার কিছু নাই। চাঁদার টাকা এমনিতেই হাতে আসবে। গ্রামে-গঞ্জে গেলে দেখবেন রাস্তার দুই ধারে শুধু স্থানীয় নেতাদেরই ছবি। ডিজিটাল যুগ। নিজের চেহারাসহ ব্যানার ফেস্টুন বানানো খুবই সহজ। কিন্তু রাজনৈতিক আদর্শের ‘আ’ সম্পর্কেও অনেকের কোনও ধারণা নাই। রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেই একটা পাওয়ার পাওয়া যাবে। এবং সেই পাওয়ারের আশায় ছুটছে অনেকে। তাদের অনেকেরই আইডল সম্রাটের মতো নেতারা।”
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে সম্রাটকে গ্রেফতার করার পর যখন তাকে ঢাকায় কাকরাইলে তার অফিসে নিয়ে আসা হয়, তখন গোটা এলাকায় উৎসুখ মানুষের ভিড় দেখা দেয়। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিল সম্রাটের অনুগত কর্মী। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে তাদের অনেকের প্রতিক্রিয়া শুনে যারপরনাই অবাক হয়েছি। একজন তো সম্রাটকে মহান নেতা বানিয়ে দিয়ে বলল, ‘ভাই কিন্তু সাধারণ মানুষের অনেক উপকার করতেন।’ তার মানে ঘটনা কী দাঁড়ালো? ঈদ অথবা এ ধরনের কোনও অনুষ্ঠান উপলক্ষে ৫০-১০০ অসহায় মানুষের হাতে সাহায্য তুলে দেওয়া মানেই কি ভালো কাজ করা? সম্রাট মাঝে মাঝে এভাবে দুস্থ মানুষকে সাহায্য করতেন। শুধু সম্রাটই নন, তার মতো আরও যারা আছেন তারাও এভাবে দুস্থ মানুষকে সাহায্য করেন। কেন করেন? এটাও এক ধরনের রাজনীতি। সাধারণ মানুষ যাতে মনে করে আহা নেতা কত ভালো! কিন্তু ভেতরে ভেতরে এ ধরনের নেতারা যে কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন, সেটা অনেকেই জানে না। সম্রাট গ্রেফতার না হলে হয়তো তার সম্পর্কেও এত কথা জানা হতো না।
প্রচার মাধ্যমেই জানলাম মালয়েশিয়ায় সম্রাটের একজন বান্ধবী আছে। শুধু তার জন্মদিন পালন করার জন্য দেড় কোটি টাকা দিয়ে একটি প্রমোদতরী ভাড়া করেছিলেন সম্রাট। সিন্ডলিং নামের ওই মালয়েশিয়ান তরুণীর জন্মদিনের পার্টিতে সম্রাটসহ অবৈধ ক্যাসিনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তার অন্যান্য বন্ধুর হাস্যোজ্জ্বল মুখের একটি ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এই যে সম্রাটরা রাজনৈতিক পরিচয়ে এতটা ভয়ংকর হয়ে উঠলেন, তার জন্য দায়ী কে? গুটিকয়েক বিপথগামী তথাকথিত নেতার কারণে রাজনীতির মতো অতি প্রিয় শব্দটি যে কাঠগড়ায় দাঁড়াল, তার দায়ভার কার?
লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

সৌদি-ইরান বিরোধ কবে থামবে


  আনিস আলমগীর
সৌদি আরব এবং ইরান দু’টি বৃহত্তম মুসলিম দেশ। উভয় রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক এবং মুসলিম উম্মাহর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মর্যাদাশালী রাষ্ট্র। মক্কা শরিফ ও মদিনা শরিফের অবস্থানের কারণে সৌদি আরব মুসলমানদের কাছে বিশেষ মর্যাদা পেয়ে আসছে। সৌদি আরবের লোকসংখ্যা কম হলেও বিশাল ভূখণ্ডের অধিকারী। তবে সমগ্র অঞ্চল প্রায় মরুভূমি। সৌদির ২০ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তন, লোকসংখ্যা মাত্র তিন কোটি ২০ লাখ। ইরানের আয়তন প্রায় সাড়ে ১৬ লাখ বর্গকিলোমিটার, লোকসংখ্যা ৮ কোটি মাত্র। উভয় দেশে সম্পদের ঈর্ষণীয় প্রাচুর্য রয়েছে। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ তেলের মজুত সৌদি আরবে, আর বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ গ্যাসের মজুত ইরানে। আবার তেল-গ্যাস উভয় সম্পদের ক্ষেত্রেও দেশ দুটি বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর কাতারে আছে।
A
১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব হওয়ার পর সম্রাট রেজা শাহ পাহলভীর পতন হয়। ইরান বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কোম শহরের ইসলামী পণ্ডিতেরা। মূল নেতা ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। তিনি ইরান সম্রাটের কোপানলে পড়ে ১৫ বছর ধরে ইরাক ও ফ্রান্সে নির্বাসনে ছিলেন। ফ্রান্স থেকেই তিনি ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কোমের আয়াতুল্লাহরা সবাই রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে। সুতরাং পাহলভী সম্রাট রেজা শাহ পাহলভীর পতনের পর থেকে ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের সুসম্পর্ক ছিল না। এখনো নেই।
ইসলাম ধর্ম অনুসারীদের মূল দুটি ধারা হচ্ছে—শিয়া ও সুন্নি। ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক শিয়া আর সৌদি আরবের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক সুন্নি। উভয় দেশে যে সংখ্যালঘু শিয়া ও সুন্নি নেই, তাও নয়। সৌদি আরবে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মানুষ শিয়া আর ইরানে সুন্নির সংখ্যাও ১০ শতাংশ। ইরানের পার্লামেন্ট বা মজলিসে ফেরকাগতভাবে প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা আছে। এমনকি ইরানে কিছু ইহুদিও বসবাস করে এবং তাদেরও মজলিসে প্রতিনিধিত্ব আছে। শাসনতন্ত্র প্রণয়নের সময় কোমের মাওলানারা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে এটি বিরল ঘটনা।
ইরান আর সৌদি আরবের সম্পর্ক এখন খুবই খারাপ। ২০১৬ সাল থেকে কূটনৈতিক সম্পর্ক পর্যন্ত নেই দুই দেশের মধ্যে। ধর্মীয় ফেরকার বাইরে দুই দেশের সম্পর্কের তিক্ততার মধ্যে আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার, আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদিদের দহরম মহরমও অন্যতম। ১৯৮০ থেকে ’৮৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ আট বছর সাদ্দাম হোসেনের কাঁধে বন্দুক রেখে সৌদি আরব-আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছে। সৌদি আরব ইরাককে অর্থ দিয়েছে, আর আমেরিকা অস্ত্র দিয়েছে সেই যুদ্ধে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশ ছিল ইরানের বিরুদ্ধে। তারপরও ইরানকে পরাস্ত করা যায়নি। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ইরান যুদ্ধবিরতি মেনে নিয়েছিল।
সৌদি আরব-ইরানের তিক্ত সম্পর্কের সাম্প্রতিক আরেকটি কারণ হচ্ছে ইয়েমেন। ইয়েমেন সৌদি আরবের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক জনপদ। কোরআন, বাইবেল এবং ওল্ড টেস্টামেন্টে ইয়েমেনের কথা উল্লেখ আছে বারবার। ইয়েমেনই ছিল রানি বিলকিসের রাজ্য। বাদশা সোলায়মান জেরুজালেম থেকে আকাশপথে সাবা এসেছিলেন, রানি বিলকিসের সঙ্গে দেখা করার জন্য।
ইয়েমেনের সঙ্গে ইরানের কোনও স্থল সীমানা নেই। ইয়েমেনের উত্তরে সৌদি আরব, দক্ষিণে এডেন উপসাগর। পূর্বে ওমান আর পশ্চিমে লোহিত সাগর। আয়তন ৫ লাখ ২৭ হাজার ৯৬৮ বর্গকিলোমিটার। লোকসংখ্যা দুই কোটি ৮০ লাখ। এখানে শিয়া-সুন্নি প্রায় সমান। সেখানকার হুথি বিদ্রোহীরা যাইডি শিয়া। হুথিরা শিয়া হলেও সুন্নিদের সঙ্গে তাদের মতপার্থক্য ইরানি শিয়াদের মতো ব্যাপক নয়। ইয়েমেনের রাজধানী সানা। এডেন হচ্ছে বড় সামুদ্রিক বন্দর। লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে প্রাচীনকাল থেকে এই বন্দরের গুরুত্ব খুবই বেশি।
২০১১ সালে আরব-বসন্তের সময় ইয়েমেনেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ বিক্ষোভের তোড়ে পদত্যাগ করেন। তার ডেপুটি আবদারাবুহ মানসুর হাদির কাছে তাকে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য করা হয়। ২০১২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাইস প্রেসিডেন্ট মানসুর হাদি ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হাদিকে অনেক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। আল কায়েদার হামলা, দক্ষিণে বিছিন্নতাবাতী আন্দোলন, সালেহের প্রতি অনেক সামরিক কর্মকর্তার আনুগত্য। এর বাইরে দুর্নীতি, বেকারত্ব আর খাদ্য সংকট। আর নতুন প্রেসিডেন্টের দুর্বলতার সুযোগে ইয়েমেনের যাইডি শিয়া মুসলিম নেতৃত্বের হুথি আন্দোলনের কর্মীরা সাডা প্রদেশ এবং আশেপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এ সময় অনেক সুন্নিও তাদের সমর্থন জোগায়। এরপর বিদ্রোহীরা সানা অঞ্চলেরও নিয়ন্ত্রণও নিয়ে নেয়।
২০১৫ সালের জানুয়ারিতে হাদি পদত্যাগে বাধ্য হন। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট সালেহের সমর্থক এবং হুথিরা মিলে তাকে গৃহবন্দি করে। হাদি পালিয়ে এডেন চলে যান এবং হুথিদের ক্ষমতাগ্রহণকে অমান্য করে এডেনকে রাজধানী ঘোষণা করেন। হুথি আর নিরাপত্তা বাহিনীগুলো সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহের প্রতি অনুগত। এরপর তারা পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। তাদের পেছনে ইরান সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। ২৫ মার্চ ২০১৫ গৃহযুদ্ধ শুরু হলে আর টিকতে না পেরে হাদি সৌদি আরবে পালিয়ে যান। হাদিকে ইয়েমেনে পুনরায় ক্ষমতায় আনতে সৌদি আরব আর অন্য আটটি সুন্নি দেশ একজোট হয়ে ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে। এই জোটকে লজিস্টিক আর ইন্টেলিজেন্স সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য আর ফ্রান্স।
২০১৫ সাল থেকে সৌদি বাহিনী বারবার ইয়েমেনের আকাশপথে, স্থলপথে আক্রমণ করে এবং কোনও জাহাজ যেন বন্দরে ভিড়তে না পারে তার প্রতি দৃষ্টি রাখে। তাতে ইয়েমেনে আকাল লেগে আছে। হাজার হাজার ইয়েমেনি শিশু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে এবং মারা যাচ্ছে। বিশ্বের মানবতাবাদী সংগঠনগুলো সৌদি আররকে বন্দরে বোম্বিং না করার আহ্বান রেখেছে। তাতে কোনও ফল হচ্ছে না। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত আর আমেরিকা এখন জোট বেঁধে হুথিদের মোকাবিলা করছে, তবুও হুথিদের নিঃশেষ করা যাচ্ছে না। সৌদি আরব ও আমেরিকার অভিযোগ—হুথিদের সমরাস্ত্র সরবরাহ করছে ইরান।
হুথিরা ড্রোন হামলা করে গত সপ্তাহে সৌদির এক তেলক্ষেত্রের প্রচুর ক্ষতি সাধন করেছে। এখন সৌদির তেল উত্তোলন অর্ধেকে নেমে এসেছে। সৌদি আরব বলেছে, হামলা ইরান করেছে। ইরান তা অস্বীকার করেছে। আসলে এত সুনিপুণ আক্রমণ হুথিদের দ্বারা সম্ভব হলো কীভাবে? ২৮ সেপ্টেম্বর হুথিরা এসব কথার জবাব দিয়েছে। এবার আক্রমণ করেছে প্রচণ্ডভাবে, তাতে সৌদিরা নির্বাক হওয়ার কথা। হুথিরা বলেছে সৌদিরা ইয়েমেনে গণহত্যা বন্ধ না করলে তারা আরও ব্যাপক হামলা পরিচালনা করবে।
২৮ সেপ্টেম্বর হুথিরা সৌদি আরবের অভ্যন্তরে যে হামলা চালিয়েছে, তা তেলক্ষেত্র হামলার চেয়েও মারাত্মক। ইয়েমেনি বাহিনী এবং হুথিরা সৌদি বাহিনীকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যেতে প্ররোচিত করেছিল। অতঃপর সৌদি ভূখণ্ডে ইয়েমেনি বাহিনী এবং হুথিরা ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে সৌদি বাহিনীকে খুবই নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন করেছিল। হুথিরা নাজরান শহর ও আশপাশের এলাকা ঘিরে ফেলেছিল। এ অভিযানে তারা প্রচুর সৌদি সৈন্য আটক করে এবং হাজার হাজার সামরিক যান ও অস্ত্র হুথিদের হস্তগত হয়।
এই অভিযানের আগে অনতিদূরে বিমানবন্দর ধ্বংস করে দিয়েছিল, যে কারণে সৌদি বিমান এই আক্রমণে সৈন্যবাহিনীকে সহযোগিতা দিতে আসতে পারেনি। এটি একটি মোড় পরিবর্তনকারী অভিযান। যুক্তরাষ্ট্রের বা সৌদি আরবের আর কোনও সুযোগ রইল না এটাতে ইরানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলার। হুথিরা রিয়াদে কিং খালেদ বিমানবন্দরেও হামলা চালিয়েছিল।
সম্ভবত এসব হামলার কারণে সৌদি জোট ইয়েমেনের শক্তিকে আর খাটো করে দেখছে না। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান এখন প্রস্তাব করেছেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করার চেয়েও রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানো উত্তম হবে। সৌদি আরব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ইরানের সঙ্গে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছিল। ইমরান খান মধ্যস্থতার ব্যাপারে সক্রিয় হয়েছেন। রাজকুমারের এই প্রস্তাবকে ইরান স্বাগত জানিয়েছে। সৌদিরা ইরানকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য ইসরায়েলের সঙ্গে দহরম-মহরম আরম্ভ করেছিল। তাদের সে প্রয়াসকে মুসলিম বিশ্ব ভালো চোখে দেখেনি।
সৌদি আরবের চিন্তা সম্ভবত তার সীমান্তবর্তী রাষ্ট্র ইয়েমেনে শিয়া মতাবলম্বীদের একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত থাকলে হয়তো তার অসুবিধা হতে পারে। সেজন্য তো ইয়েমেনে হাজার হাজার বোমা নিক্ষেপ করে নির্বিচারে নিরীহ মানুষ হত্যা করা সৌদির উচিত হয়নি। দীর্ঘদিন তাদের বন্দরে কোনও জাহাজ নোঙর করতে পারছে না। সৌদিদের বিমান আক্রমণের ভয়ে হাজার হাজার শিশু অপুষ্টিতে মরছে আর ইয়েমেনিরা মরছে অনাহারে। জাতিসংঘ বারবার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইয়েমেনের দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে।
মুসলিম বিশ্ব সৌদি আরবকে ভ্যাটিকানের ভূমিকায় দেখতে চায়। সৌদি আরবের উচিত নিজেকে নিরপেক্ষ ভূমিকায় প্রতিষ্ঠা করা। তাদের মনে রাখা দরকার তারা হেরেমাইনের খাদেম। অমানবীয় যে কোনও কাজ তাদের জন্য অশোভনীয়। আমরা আশা করি সৌদি আরব আর ইরান রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য সংলাপ শুরু করবে। বিরোধ থামিয়ে শান্তির পথে হাঁটবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
anisalamgir@gmail.চম

মুক্তচিন্তা ও খুনের জায়েজিকরণ


 আমীন আল রশীদঃঃ
কথিত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে ব্লগারদের বিরুদ্ধে যে কিলিং মিশন শুরু করেছিল উগ্রবাদীরা, সেই হত্যাকাণ্ডকে তারা ‘নাস্তিকের বিরুদ্ধে জিহাদ’ বলে জায়েজের চেষ্টা করেছিল। ২০১৩ সালে রাজীবকে খুন করার মধ্য দিয়ে যে ব্লগার হত্যা শুরু হয়, তারপর একে একে খুন হয়েছেন লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান, অনন্ত বিজয় দাশ ও নিলাদ্রী চট্টোপাধ্যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের ছেলে জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপন। যেদিন দীপনকে রাজধানীর আজিজ মার্কেটে ঢুকে খুন করা হয়, সেদিনই লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর কার্যালয়ে ঢুকে হামলা চালানো হয় লেখক ও এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল, ব্লগার তারেক রহিম ও রণদীপম বসুর ওপর। শুদ্ধস্বর অভিজিৎ রায়ের বইয়ের অন্যতম প্রকাশক।
A
উগ্রবাদীদের হত্যা জায়েজের এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারদের হাতে কেউ খুন হওয়ার পরে তাকে ‘শিবিরকর্মী’ বলে চালিয়ে দেওয়ার কৌশলের মধ্যে খুব বেশি তফাৎ নেই। অর্থাৎ বিষয়টা এরকম, কেউ নাস্তিক হলেই কিংবা শিবিরকর্মী হলেই তাকে খুন করা বৈধ এবং এই সমাজ রাষ্ট্রে ভিন্নমত পোষণকারীর বেঁচে থাকার কোনও অধিকার নেই। সবশেষ সেই অধিকারবঞ্চিতের তালিকায় যুক্ত ব্যক্তিটির নাম আবরার ফাহাদ, যিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (১৭তম ব্যাচ) শিক্ষার্থী।
গণমাধ্যমের খবর বলছে, আবরার ফাহাদ রোববার (৬ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। মধ্যরাতে শেরে বাংলা হলের সিঁড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ। এর আগের দিন শনিবার বিকেল ৫টা ৩২ মিনিটে তিনি ফেসবুকে সবশেষ একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন, যেখানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিষয়ে তিনি নিজের ভাবনা তুলে ধরেন। আবরার ওই স্ট্যাটাসে যা লিখেছেন, সেখানে কয়েকটা লাইন এরকম : ‘৪৭-এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোনও সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ৬ মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিছিলো। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মংলা বন্দর খুলে দেওয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ ইন্ডিয়াকে সে মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে।’
পুলিশ, সহপাঠী ও স্বজনদের বরাতে জানা যাচ্ছে, মূলত এই স্ট্যাটাসের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে রবিবার আবরারকে ধরে নিয়ে যায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। তারপর তার মোবাইল ফোন চেক করা হয়। এরপর তাকে শিবিরকর্মী সন্দেহে বেধড়ক পেটানো হয়। যাতে মৃত্যু হয় আবরারের।
প্রশ্ন হলো আবরার ফেসবুকে যা লিখেছিলেন সেখানে কি রাষ্ট্রদ্রোহ ছিল, নাকি দেশপ্রেম? যদি তার বক্তব্যে ভারতবিরোধিতার গন্ধও থাকে, তাহলে বলতে হবে সেই বিরোধিতাটুকুর জন্ম দেশপ্রেম থেকেই এবং এটুকু বলার অধিকার যেকোনও নাগরিকের রয়েছে। বরং অনেকেই ফেসবুকে বা বিভিন্ন লেখায় এর চেয়ে অনেক কড়া ভাষা ব্যবহার করেন। কিন্তু আবরারকেই প্রাণ দিতে হলো। কারণ তাকে মেরে ফেলাটা ছাত্রলীগ নেতাদের জন্য সহজ ছিল। এ জাতীয় খুনের পেছনে শুধু যে খুন হওয়া ব্যক্তির কোনও কাজই প্রধান তা নয়, বরং এখানে খুনিদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন এবং তারা যে ‘আনচ্যালেঞ্জড’, এটা বোঝানোও একটা উদ্দেশ্য থাকে। আবার আবরারের মুখে কিছুটা দাড়ি ছিল বলে তাকে সহজেই ‘শিবিরকর্মী’ বলে চালিয়ে দেওয়াটাও যেহেতু সহজ ছিল, ফলে খুনিরা সেই কৌশলটিই নিয়েছিল। কিন্তু পরে যখন কুষ্টিয়ার স্থানীয় সাংবাদিকরা জানালেন, আবরারের পরিবারের লোকেরা আওয়ামী লীগের সমর্থক এবং শিবিরের সঙ্গে আবরারের কোনও সম্পৃক্ততা ছিল না, তখন সেই অপপ্রচারটি আর হালে পানি পায়নি। কিন্তু ধরা যাক আবরার সত্যি সত্যিই শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, তারপরও কি ছাত্রলীগকে এই হত্যার অনুমতি দেওয়া আছে? একসময় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে শিবির যা করতো, যেভাবে প্রতিপক্ষের রগ কেটে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতো, সেই একই কাজ যদি বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতে গড়া ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও করেন, তাহলে শিবিরের সঙ্গে তাদের আর কী পার্থক্য থাকে?
তবে বুয়েটের এই ঘটনায় দুটি বিষয় উল্লেখযোগ্য—১. ঘটনার পর দ্রুতগতিতে পুলিশ অপরাধীদের আটক করেছে, এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে সিসি ক্যামেরা এবং ২. সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘ভিন্নমতের কারণে একজন মানুষকে মেরে ফেলার অধিকার কারও নেই।’ দেশের সবচেয়ে বড় এবং ক্ষমতাসীন দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতার মুখ থেকে এরকম বক্তব্যই জাতি আশা করে।
আবরারের ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক ফেসবুকে যা লিখেছেন সেখান থেকে কয়েকটা লাইন উদ্ধৃত করা যায়—‘আওয়ামী লীগ যেকোনও বিরুদ্ধমতকে শিবির নামে চালিয়ে তার ওপর হত্যা-নির্যাতন করার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করছে দেশে প্রচুর জামায়াত-শিবির রয়েছে।…আর শিবির-স্টিগমার যেরকম ব্যবহার-অপব্যবহার করা হচ্ছে, তার মধ্য দিয়ে তারা এও প্রমাণ করে ছাড়বে, তাদের তুলনায় শিবির অপেক্ষাকৃত পবিত্র দল।’
তকমার রাজনীতি আমাদের দেশে নতুন কোনও প্রবণতা নয়। অর্থাৎ আমার বক্তব্যের সঙ্গে আপনার বক্তব্য বা ভাবনা না মিললেই আমি আপনার শত্রু। অথচ যেকোনও বিষয়ে দু’জন মানুষের ভাবনা দুরকম হওয়াটাই স্বাভাবিক এবং এই ভিন্নমতকেই বলা হয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি ও সৌন্দর্য। কিন্তু যেহেতু আমরা মুখে মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও অন্তরে এটা লালন করি না, ফলে কেউ যখন কোনও বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন, আমরা ধরেই নিই তিনি আমাদের শত্রু। যে কারণে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনকারীদের মধ্যে খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যই জঙ্গিবাদের ভূত দেখেছিলেন। এর অব্যবহিত পরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু প্রগতিশীল শিক্ষক, যারা তাদের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বা ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের অনেককেই আকারে-ইঙ্গিতে সরকারবিরোধী, বিএনপি-জামায়াতের দোসর ইত্যাদি গালি দেওয়া হয়েছিল।
চলমান রাজনীতি নিয়ে ভিন্নমতের কারণে বিষোদ্গারের শিকার হয়েছেন দেশ-বিদেশের একাধিক স্বনামধন্য অধ্যাপক ও বরেণ্য ব্যক্তিত্ব। অথচ তাদের মতামত নিয়ে অ্যাকাডেমিক তর্ক হতে পারতো। কিন্তু রাজনীতির মতো সিরিয়াস ও জনপ্রিয় বিষয়ে অ্যাকাডেমিক তর্কের জায়গাটি এখন দখল করেছে গালাগাল, বিষোদ্গার আর নানাবিধ তকমা, এমনকি শারীরিক আক্রমণ। পরিহাস হলো, যে বিদগ্ধজনদের নানারকম আক্রমণ ও বিষোদ্গার করা হয়েছে, তাদের অনেকেই চিন্তা-চেতনায় প্রগতিশীল; মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের এবং আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে তারা হয় আওয়ামী লীগের সপক্ষের কিংবা বামপন্থী বলে পরিচিত। অর্থাৎ কোনও অর্থেই তারা প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তার মানুষ নন। কিন্তু শুধু ভিন্নমত ও ভিন্ন ভাবনার কারণে তারাও গালাগালের শিকার।
উগ্রবাদীদের হামলায় গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পরে মৃত্যুবরণ করেন প্রথাবিরোধী লেখক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ। তিনি লিখেছেন, ‘যে বুদ্ধিজীবী নিজের সময় ও সমাজ সম্পর্কে সন্তুষ্ট, সে গৃহপালিত পশু।’ সুতরাং যে শিক্ষক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের সময় ও সমাজ সম্পর্কে সন্তুষ্ট নন, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, কথা বলেন, যারা বৈষয়িক নানারকম সুবিধা পাওয়ার লোভে রাষ্ট্রযন্ত্রকে তেল দেন না, তারাই মূলত সমাজের অগ্রসর অংশ; তারাই সমাজের সৌন্দর্য, তারাই সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধার পাত্র। একটি সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্রে এই মানুষগুলোরই সবচেয়ে বেশি সম্মানিত হওয়ার কথা। মার্কিন সরকারের সবচেয়ে বড় সমালোচক নোয়াম চমস্কি সেদেশের সব দল ও মতের কাছেই গ্রহণযোগ্য এবং সবাই তাকে সমীহ করেন।
কিন্তু সেই সংস্কৃতির চর্চাটি যে সোশ্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথা, সেটি ব্যবহারের জন্য আমরা আদৌ প্রস্তুত কিনা বা যারা এ মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছেন, তাদের কতজন এই মাধ্যমটি ব্যবহারের যোগ্য, সেই প্রশ্নটিও মাঝেমধ্যে শুনতে হয়। শুধু অল্পশিক্ষিত লোকই নন, উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজে সম্মানিত মানুষ হিসেবে পরিচিত অনেক লোকও ফেসবুকে যেসব কথাবার্তা লেখেন, নিজের মতের সঙ্গে না মিললে যেভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন এবং তকমা লাগিয়ে দেন, তাতে অনেক সময়ই মনে হয়, শিক্ষা-দীক্ষা-পদ-পদবি যাই হোক, মানুষ তার ভেতরটা পাল্টাতে পারে খুব সামান্যই। যদি এই পাল্টানোর ইচ্ছাটা তার নিজের না থাকে।
বাস্তবতা এখন এমন, যারা ফেসবুকে সমসাময়িক নানা বিষয়ে নিজের ভাবনা ও মতামত শেয়ার করেন, তারা সব সময়ই কোনোভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ অথবা তকমার রাজনীতির শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। নিজের মতের সঙ্গে না মিললেই তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের লোক অথবা বিরুদ্ধবাদী বলে আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবেই যে একটি অসহিষ্ণু সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে উঠছে, ফেসবুক তার একটি বড় আয়না। ফলে এই আয়নায় নিজেদের মুখটি দেখে চিনতে পারা এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা শুরুর কোনও বিকল্প নেই—যদি আমরা সত্যিই একটা মানবিক, পরমতসহিষ্ণু এবং গণতান্ত্রিক সমাজের কথা চিন্তা করি। সেইসঙ্গে আমাদের এটিও প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তচিন্তার বিকাশ ও নতুন জ্ঞান তৈরির কারখানা; খুনের প্রশিক্ষণকেন্দ্র নয়। ভিন্নমত মানেই তাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে কিংবা ক্রিকেটের স্ট্যাম্প দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলার অধিকার রাষ্ট্র, সংবিধান ও আইন যে কাউকে দেয়নি, সেটি প্রমাণ করতে হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আবরারের খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের কোনও বিকল্প নেই।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর।

ছাত্ররাজনীতি কতটা বাঞ্ছনীয়?


 সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাঃঃ
সহিংসতার জন্য যুক্তি লাগে না, লাগে কেবল একটি উপলক্ষ। বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদের ফেসবুক পোস্ট ছিল একটি উপলক্ষ মাত্র, আগের বহু ঘটনার মতোই এই ঘটনায়ও আমরা বুঝতে পারছি, আমাদের ছাত্ররাজনীতি কেবল নিষ্ঠুরতা আর হিংসার পাঠ দেয়, সেটা যে বিদ্যাপীঠই হোক না কেন। এবং আমাদের রাজনীতি এই শিক্ষাও দেয়, যেকোনোভাবেই হোক একটি পর্যায়ে গিয়ে খুনিদের পেছনে একটি গোষ্ঠীর সমর্থন থাকছে এবং থাকবে।
A
‘বেরিয়ে আসছে নির্যাতনের রোমহর্ষক সব ঘটনা’—এই শিরোনামে মঙ্গলবার প্রথম পাতায় দৈনিক সমকাল একটি প্রতিবেদন করেছে। রিপোর্টার লিখেছে, বুয়েটের হলে হলে এক শ্রেণির ছাত্রলীগ নেতার নির্যাতন সেল আছে এবং সেগুলোয় এ পর্যন্ত ঘটেছে শত শত নির্যাতনের ঘটনা। আবরার হত্যার পর ঘটনা সামনে এলো কেবল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সব জেনেও নীরবে মেনে নিয়েছে, যেমন করে উপাচার্য তার ছাত্রের জানাজায় না এসে নীরব থেকেছেন নিজ বাড়িতে।
A
কিছু কিছু ঘটনায় হৃদয় যেভাবে সাড়া দেয়, মস্তিষ্ক তাতে ষোলো আনা সায় দিতে পারে না, প্রশ্ন তোলে। জানি এবং মানি, ছাত্ররাজনীতি যারা করে সবাই সমান নয়। কিন্তু একথা কি সবাই মানি, বিদ্বেষের রাজনীতি প্রচারের যে তুমুল ও বহুমুখী প্রচেষ্টা চলছে, তার প্রধান লক্ষ্য দেশের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। নানাভাবে, নানা দিক থেকে এই রাজনীতি তাদের দখল নিতে চায়। যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনও সেই সর্বগ্রাসী তৎপরতার কাছে আত্মসমর্পণ করেনি বলে আমরা জানতাম, তার অন্যতম বুয়েট। কিন্তু আমরা ভুল জানতাম।
রাজনীতি যে ক্রমেই বিপরীত মতকে গণতান্ত্রিক পরিসর ছাড়তে ব্যর্থ হচ্ছে, তা আরও একবার প্রমাণিত হলো। আবরারের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসের জন্য পাল্টা যুক্তি না দেখিয়ে তাকে টানা সাত ঘণ্টা নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। এবং এরা কতটা নির্দয় আর নিষ্ঠুর হলে, খুন করে এসে আরাম করে, ঠান্ডা মাথায় টিভিতে ফুটবল খেলা দেখতে পারে!
আমাদের একটা স্বাভাবিক প্রত্যাশা থাকে, যারা উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতি করেন, শিক্ষক বা ছাত্র, অন্যদের তুলনায় তাদের রাজনীতিতে চিন্তার প্রসারতা তুলনামূলক বেশি থাকবে, কারণ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য মনকে প্রসারিত করা। এমন একটি প্রত্যাশার প্রেক্ষিতে বুয়েটের আবরার ফাহাদ হত্যাকে দেখলে আমাদের আর কোনও আশার জায়গা থাকে না। কারও মতামত পছন্দ না হতে পারে, কিন্তু তাকে বলবার সুযোগই দেওয়া যাবে না, এই উগ্রতা সমাজের অগ্রতার প্রশ্নে প্রাণঘাতী।
ছাত্ররাজনীতি কতটা হিংসাত্মক হয়ে উঠেছে, তার বিপজ্জনক উদাহরণ আবরারের খুন। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কলেজের ছাত্ররাজনীতিতে সহিংসতার আধিক্য বহু দিনের। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশের নানা প্রান্তে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে যে আতঙ্কের পরিবেশ আমরা দেখছি, তা অভূতপূর্ব। আমরা এতটাই বিভাজিত হয়েছি, পরিস্থিতি যতই অগ্নিগর্ভ হোক, কিছু মানুষের নিকট রাজনৈতিক আনুগত্য বজায় রাখাই অধিকতর জরুরি। তারা বলে চলেছে, যেহেতু পুলিশ খুনিদের আটক করেছে, তাই আন্দোলনের প্রয়োজন নেই, খুনের প্রতিবাদ করার প্রয়োজন নেই।
আজ যা ছাত্রলীগ করছে, আগে তা করেছে ছাত্রদল, শিবির—কম বা বেশি। আমাদের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বহু দিন যাবৎ সহিংসতানির্ভর। ইসলামী ছাত্রশিবিরের রগ কাটা থেকে আজকের এই পিটিয়ে হত্যা। কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন, এবার হিংস্রতার মাত্রা হয়তো বেড়েছে, কিন্তু তা মাত্রার ফারাক মাত্র, চরিত্রের নয়। এবার নতুন কী হলো? আসলে যা নতুন, তা-ই সর্বাধিক উদ্বেগের। এত দিন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তারে লড়াই হতো, মারামারি হতো, এখন এক অতি অপরিচিত অরাজনৈতিক ছাত্র নৃশংসভাবে খুন হলেন শুধু একটি ফেসবুক পোস্টের জন্য।
যুবলীগের কিছু নেতার ক্যাসিনো সাম্রাজ্য, ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন ছাত্রলীগ বা যুবলীগ আওয়ামী লীগের কোন কাজে লাগে? প্রধামন্ত্রীর সব ভালো কাজ জনতার দরবারে ম্লান হয়ে যায় এদের কাণ্ডে। বুয়েটের এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবে পুরো ছাত্ররাজনীতি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে ‘কী প্রয়োজন ছাত্ররাজনীতির?’
খুন, সহিংসতা, হানাহানি আর রাজনীতির সমার্থক হয়ে ওঠা সামাজিক অমঙ্গল। আমরা সাধারণ মানুষেরা সামগ্রিক সচেতনতার দিকে এগিয়ে না গিয়ে স্রোতে ভাসিয়ে দিচ্ছি নিজেদের। আর চারপাশের ব্যবস্থা ক্রমে পরিবর্তন হতে হতে এমন এক পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়াচ্ছে, যেখানে বিভিন্ন বিষয়ের শিকার হলেও আমাদের বিরোধিতার সুর একরকম শোনাচ্ছে না। একটি অতি বিভাজিত সমাজে হয়তো এটাই স্বাভাবিক।
দেশের বর্তমান সাংবিধানিক আইন অনুসারে আঠারো বছর বয়স হলেই যেকোনও নাগরিক নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার অর্জন করেন। গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিকের মতামতের মূল্য সমান। সেই বিবেচনায় রাজনীতি ছাত্র-ছাত্রীরা করবেই। কিন্তু কী সেই রাজনীতি? পশ্চিমা সমাজে ছাত্রছাত্রীরা যথেষ্ট রাজনীতি করে। সেখানে রীতিমতো ছাত্র আন্দোলন হয়, ছাত্র ধর্মঘটও হয়। কিন্তু যা হয় না তা হলো ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতি। আমাদের সমস্যা আমাদের ছাত্রজীবনে দলীয় রাজনীতির ব্যাপক অনুপ্রবেশ। রাজনৈতিক দলের কাছে ছাত্র সংগঠন লেজুড়ে পরিণত হওয়ার কারণে ক্যাম্পাসে দলাদলি, বিশৃঙ্খলা আর হিংসা প্রবলভাবে বেড়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
ছাত্ররাজনীতিতে দলীয় প্রভাব কমলে সহিংসতা কমবে, চাঁদাবাজির সংস্কৃতি বন্ধ হবে, আধিপত্যের লড়াই কমবে। দিনে দিনে বড় হয়ে ওঠা সমস্যার চটজলদি সমাধান নেই, কিন্তু একটা রাজনৈতিক দলের কোনও অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন থাকবে না, আর এমন একটা উদ্যোগ সরকার নিতে পারে এখনই।
লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

রাজনীতি ও রসবোধ


 রাশেক রহমান
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পরে বাংলাদেশের রাজনীতি হয়ে উঠেছিল প্রায় অন্তঃসারশূন্য। সেই গতানুগতিক ধারা পরিবর্তনের সূচনা ঘটে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার পরে। রাজনীতিতে তিনি ফিরিয়ে আনেন একজন প্রকৃত রাজনীতিবিদের দর্শন। ইংরেজ রাষ্ট্রনায়ক, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী স্যার উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন রাজনীতিবিদের পরবর্তী দিন, সপ্তাহ, মাস ও বছরের ভবিষ্যৎ নিয়ে দূরদর্শিতা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সেই ক্ষমতা থাকাও প্রয়োজন যিনি কোনও কিছুর ব্যত্যয় ঘটলে তার কারণ বলতে পারবেন। শুধু দূরদর্শিতায় নয় বরং বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক রসবোধও ফিরিয়ে এনেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। সম্প্রতি ভারত সফরে তিনি একজন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে যে বলিষ্ঠ বক্তব্য রেখেছেন তাতে দেখা যায় তার রসবোধ অনেক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছেও।
A
সম্প্রতি বাংলাদেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম নিয়ে যে আলোচনার ঝড় ওঠে তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নয়াদিল্লিতে আইসিটি মৌর্য হোটেলের কামাল মহল হলে আয়োজিত ভারত-বাংলাদেশ বিজনেস ফোরামের (আইবিবিএফ) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যেভাবে কথা বলেন, সেটাতে অনেকে ভাবতে পারেন উনি হয়তো রসবোধ থেকেই বলছেন। তিনি তার বক্তব্যের মাঝে হঠাৎ করেই হিন্দিতে বলা শুরু করেন, ‘পেঁয়াজ মে থোড়া দিক্কত হো গিয়া হামারে লিয়ে। মুঝে মালুম নেহি, কিউ আপনে পেঁয়াজ বন্ধ কার দিয়া! ম্যায়নে কুক কো বোল দিয়া, আব সে খানা মে পেঁয়াজ বান্ধ কারদো (পেঁয়াজ নিয়ে একটু সমস্যায় পড়ে গেছি আমরা। আমি জানি না, কেন আপনারা পেঁয়াজ বন্ধ করে দিলেন। আমি রাঁধুনিকে বলে দিয়েছি, এখন থেকে রান্নায় পেঁয়াজ বন্ধ করে দাও)।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভারত রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়, আর তাতে সমস্যায় পড়ে বাংলাদেশ। ভারত এই নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বাংলাদেশকে আগে জানালে, ঢাকা অন্য কোনও দেশ থেকে পেঁয়াজ আনার ব্যবস্থা করে নিতো।’
A
A
বক্তব্যে তিনি এমনভাবে বিষয়টা উপস্থাপন করেন যেখানে ফুটে ওঠে সমস্যার মূল কারণ। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল এবার সফরসঙ্গী হিসেবে তার সঙ্গে যাওয়ার এবং সামনে থেকেই এই বক্তব্য শোনার। প্রধানমন্ত্রীর এমন রসিকতাকে দর্শকরা করতালি দিয়ে স্বাগত জানান। আর রসবোধ নাড়িয়ে তোলে দিল্লির মসনদকেও। এর পরেই আমরা দেখি বাংলাদেশের স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের পেঁয়াজ প্রবেশ করার বিষয়টি এবং একই সঙ্গে বাজারে স্থিতিশীলতা আসার ব্যাপারও।
A
১৯৪৮ সালে ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়াকে সাময়িকভাবে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ জ্যোতি বসু তখন কমিউনিস্ট পার্টি একজন তরুণ রাজনীতিবিদ ছিলেন। তার বিরুদ্ধেও একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। সেই সময়ে পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ডা. শ্রী বিধান চন্দ্র রায়। একজন ভালো বক্তা হিসেবে জ্যোতি বসুকে খুব পছন্দ করতেন ডা. রায়। তিনি জ্যোতি বসুকে ফোন করে বললেন, জ্যোতি তোমার জন্য একটা গাড়ি পাঠাচ্ছি। গাড়ি করে তুমি আমার বাড়ি চলে এসো। এখানে কয়েকদিন থেকো। আমি তো ছোট মাছ খাই, কিন্তু তুমি তো বড় মাছ খেতে ভালোবাসো, যেটা তুমি এখানে পাবে না। তবে ছোট মাছ ও ভাত তোমাকে আমি রোজই খাওয়াবো। এখানেই থেকো কারণ তুমি যদি না আসো তবে পুলিশের একটি ওয়ারেন্ট বের হয়েছে তোমার বিরুদ্ধে এবং সেটা দিয়ে পুলিশ তোমাকে প্রেসিডেন্সি জেলে নিয়ে যেতে পারে।
A
এটাকে বলা যেতে পারে এক ধরনের মজা বা রসবোধ। কিন্তু এখানে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করা ও তা বজায় রাখার বিষয়টিও সামনে চলে আসে।
A
শুধু রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ক্ষেত্রেই নয় বরং অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও একদিকে দেখা যায় রসবোধ আর অন্যদিকে দূরদর্শিতা। এবারের ভারত সফরে এশিয়াটিক সোসাইটি অব কলকাতা আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে সম্মানসূচক টেগোর পিস অ্যাওয়ার্ড দেয়। সেখানে দেওয়া এক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পাকিস্তান আমলে যখন রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করা হলো তখন তৎকালীন গভর্নর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবদুল হাই সাহেবকে ডেকে বলেছিলেন আপনারা এতো রবীন্দ্রসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত করেন, নিজেরা একটা দুইটা রবীন্দ্রসঙ্গীত লিখতে পারেন না?’ জবাবে আবদুল হাই সাহেব বলেছিলেন, ‘যদি অন্য কেউ সঙ্গীত লেখেন তবে সেটা রবীন্দ্রসঙ্গীত কীভাবে হবে?’ নিজের বক্তব্যে এভাবেই পাকিস্তান আমলে সংস্কৃতি অঙ্গনে যে স্থবিরতা আনার চেষ্টা করা হয়েছিল তা ফুটিয়ে তোলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। তিনি তার বক্তব্যে প্রায়ই রসবোধের সঙ্গে এমনভাবে বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলেন, যা ভাবিয়ে তোলে। আর রাজনীতিতে এই হিউমারটা ফিরে আসা খুবই জরুরি। ধ্বংসাত্মক বক্তব্য, কর্মকাণ্ড আর যাই হোক, রাজনীতিতে কখনও গঠনমূলক কিছু গড়তে পারে না। আর সেক্ষেত্রে এমন রসবোধ জন্ম দেয় এক নতুন ধারার রাজনীতি, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। পৃথিবীর বিখ্যাত সব রাজনীতিবিদ যারা বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতির চর্চা করেছেন, তাদের সবার মাঝেই রসবোধ, হিউমার খুঁজে পাওয়া যায়। আমার নেত্রীও ভীষণ বুদ্ধিদীপ্ত এবং বাস্তববাদী একজন রাজনীতিবিদ। আর তাই তো তিনি এখন শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্ব রাজনীতিতেও একজন জীবন্ত কিংবদন্তি।
A
লেখক: রাজনীতিবিদ

ভিন্নমত ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

 
 মো. আবুসালেহ সেকেন্দার
ডিসেম্বর-মার্চ এলেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গদ গদ করি। যদিও প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কী সেই বিষয়টি মনে-প্রাণে ধারণ করাতো দূরের কথা, একটু বুঝতেও চেষ্টা করি না। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভেতরে ধারণ করতে চাইলে ধান্দাবাজি করা যাবে না সেই বিষয়টি অবশ্য জানি! তাই যে যা বলুক ভাই বাইরেই কেবল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারণকারী হতে চাই!’– এমন চেতনাধারীতে এখন দেশ ভরে গেছে। আর এই কথিত চেতনাধারীরাই তাদের স্বার্থবিরোধী সত্য কথা বললেই যাকে-তাকে রাজাকার, জামায়াত, শিবির অভিধায় অভিহিত করে হয়রানি করছে। বুয়েটের ছাত্র আবরারের মতো পিটিয়ে মেরে ফেলছে। যদিও সব শুদ্ধ মতের মানুষের নিরাপদ আবাসভূমি প্রতিষ্ঠাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শর্ত।
A
পাকিস্তানিদের মতো সত্য কথা প্রকাশকারীদের দেশবিরোধী-ইসলামবিরোধী অভিহিত করাটা আর যাই হোক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হতে পারে না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মনে হয়, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দূরে ঠেলে দিয়ে পাকিস্তানি চেতনায় ফিরে যাচ্ছি। তাই ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনে পাকিস্তানিদের কৌশল অবলম্বন করে যাকে-তাকে স্বাধীনতাবিরোধী, রাজাকার, জামায়াত, শিবির অথবা ইসলাম ধর্মবিরোধী, নাস্তিক ইত্যাদি বলছি।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাদের সমালোচনাকারীদের ‘ভারতের চর’ অথবা ‘নাস্তিক’ উপাধি দিয়ে দেশ ছাড়ার সব বন্দোবস্ত করে। যারা জন্মভূমির মায়ায় এদেশ ছেড়ে যেতে চায়নি, তাদের ওপর নেমে এসেছিল জুলুম-নির্যাতন-নিপীড়ন। জেলের অন্ধকার কারাগার হয়েছিল তাদের ঠিকানা। এক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবীরা ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চোখের বালি। বাঙালিদের ন্যায্য অধিকার ও দাবি-দাওয়াকে সমর্থন করলেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও ইয়াহিয়া গংদের দৃষ্টিতে বুদ্ধিজীবীদের হতে হয়েছিল ধর্মদ্রোহী অথবা ভারতের দালাল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের এ দেশীয় সহযোগী আল-বদর, আল-শামস, রাজাকাররা বাঙালি নিধনকে বৈধতা দিতেও এ তত্ত্ব ব্যবহার করে। তারা প্রচার করে, ‘ইসলাম ধর্মকে রক্ষা ও ভারতের দালালকে প্রতিহত করতেই তাদের এই অভিযান।’ ১৯৭১ সালে প্রকাশিত সংগ্রাম পত্রিকার পাতায় পাতায় তৎকালীন বদর বাহিনী নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে বিষয়টি স্পষ্ট।
ভিন্নমতাবলম্বীদের মতকে যুক্তি নয়, অস্ত্রের মাধ্যমে মোকাবিলা করার পাকিস্তানি মানসিকতা স্বাধীন বাংলাদেশেও দেখা যায়। সামরিক শাসনামলে ভিন্নমত বা পথের মানুষ হওয়ার কারণে গোপনে বহু সামরিক- বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা না হলেও নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। হামলা-মামলার বহু ঘটনা ঘটেছে। সত্য বলায় বারবার বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করায় শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মতো মহীয়সী নারীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে যে অবস্থার খুব পরিবর্তন হয়েছে তা বলা যাচ্ছে না। কেউ আওয়ামী লীগ ও সরকারের সমালোচনা করলেই তাকে রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ইত্যাদি বলে দমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। শুধু মতের পার্থক্য থাকায় অনেককে নিষিদ্ধ করা হয়েছে শহীদ মিনারে। অথচ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভিন্নমত সহজে গ্রহণ না করার ফলই আজকের শহীদ মিনার, স্বাধীন বাংলাদেশ। আজ আমরা সেই স্বাধীন বাংলাদেশেই ভিন্নমতকে যুক্তির মাধ্যমে নয়, শক্তির মাধ্যমে প্রতিহতের চেষ্টা করছি। প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে আমরা চিন্তাচেতনায় কি সেই পাকিস্তানের দিকেই ফেরত যাচ্ছি?
আমরা ব্যক্তিগতভাবে অনেকের সব মতের সঙ্গে সর্বক্ষেত্রে একমত নাও হতে পারি। তবে এই মতভিন্নতার কারণে যারা তাদের শহীদ মিনারে নিষিদ্ধ করছে অথবা রাজাকার, জামায়াত, শিবির বলে পিটিয়ে হত্যা করছে, হামলা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে, তাদেরও সমর্থক নই। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের ভাষায় বলতে চাই: ‘আমি তোমার মত মানি না, কিন্তু তুমি যাতে অবাধে বলতে পার, তার জন্য আমি নিজের প্রাণ অবধি বিসর্জন দিতে প্রস্তুত।’ এটা শুধু ভলতেয়ারের কথা নয়; আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের চেতনাও বটে।
সরকারের অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে কথা বললেই সেটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়ে যায় না। রাষ্ট্র ও সরকার আলাদা দুটি সত্তা। ১৯৪৭ থেকে ৭১ (যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়ে বাদে) দেশপ্রেমিক রাজনীতিকরা পাকিস্তানি শাসনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। শিক্ষক, সাংবাদিক তথা বুদ্ধিজীবীরা সত্য কথা বলেছিলেন। আর এই রুখে দাঁড়ানোর কারণ ছিল গণতন্ত্রহীনতা। আজ দেশ যদি সেই গণতন্ত্রহীনতার পথে হাঁটে, আর কেউ গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলেন, তবে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শত্রু নয়, বরং প্রকৃত বন্ধু।
আজ যারা দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে কথা বলছেন তাদের রাজাকার বলে গালি দেওয়া, শহীদ মিনারে নিষিদ্ধ করা; আর যাই হোক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নয়। তবে হ্যাঁ, কেউ যদি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র করে তাহলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কিন্তু রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র আর সরকারের সমালোচনা করা এক বিষয় নয়। সরকারের সমালোচনা করলেই এখন তাকে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভিন্নমত দমনের এই প্রতিক্রিয়া থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। পরিশেষে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিশ্বাসীদের উচিত হবে কাউকে রাজাকার, জামায়াত, শিবির, দেশবিরোধী বলার আগে তার অবস্থানকে বা বক্তব্যকে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দৃষ্টিাকোণ থেকে বিচার করা। কেউ সত্য বললে তা মেনে নেওয়া। বিশ্বকবির ভাষায়: ভালো মন্দ যাহাই আসকু/সত্যেরে লও সহজে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ-ভারতের চুক্তিগুলো নিয়ে কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য


 ড. সেলিম মাহমুদঃঃ 
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে যারা আজ মায়াকান্না করছেন, তাদের উদ্দেশে কিছু কথা বলতে চাই। ভৌগোলিক দিক থেকে বাংলাদেশ পুরোপুরি তিন দিক থেকে ভারতের সীমানা দ্বারা পরিবেষ্টিত। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারতের মোট সীমানা ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার, যা পৃথিবীর পঞ্চম দীর্ঘ স্থল সীমানা। এই দীর্ঘ সীমানা সম্বলিত নিকটতম প্রতিবেশী হওয়ার কারণে দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু পারস্পরিক নির্ভরশীলতার বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ ধরনের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমাদের অনেক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই স্বার্থ আদায়ের একমাত্র পথই হচ্ছে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে চুক্তি সম্পাদন। পৃথিবীর সব সভ্য ও উন্নত দেশ তাদের প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণ করেছে। ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো তাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে অসংখ্য চুক্তি করেছে।
A
বাংলাদেশ-ভারতের চুক্তিগুলো
বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে এ যাবৎ ৯১টি চুক্তি/সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় মোট ১১টি চুক্তি হয়েছিল, যার সবকটিই বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য করা হয়েছিল। পঁচাত্তর পরবর্তী তিন সরকারের সময় অর্থাৎ জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ ও খালেদা জিয়ার তিন সরকার মিলে সর্বমোট তিনটি চুক্তি করতে সক্ষম হয়েছিল। ৫ মে ১৯৭৮ তারিখে বিমান চলাচল সম্পর্কিত একটি চুক্তি হয়। ২০ ডিসেম্বর ১৯৮০ তারিখে দুই দেশের ব্যবসায়ী সমিতিগুলোর মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তারপর ৩১ জুলাই ১৯৯১ তারিখে দুই দেশের মধ্যে বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি বিষয়ে সহযোগিতা সম্পর্কিত চুক্তি হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের উদ্যোগে ভারতের সঙ্গে মোট ৭৭টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তিগুলোর প্রায় সবকটিই বাংলাদেশের স্বার্থে করা হয়েছিল।
আপনাদের মনে আছে, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সম্পাদিত পঁচিশ বছরের ফ্রেন্ডশিপ চুক্তিকে ‘গোলামি চুক্তি’ বলে অপপ্রচার করেছিল পঁচাত্তর পরবর্তী অবৈধ সরকারগুলো ও তাদের উচ্ছিষ্টভোগী কিছু নীতিভ্রষ্ট বুদ্ধিজীবী। অথচ জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ ও মর্যাদার সুরক্ষা বিবেচনায় জাতির পিতার সরকারের সঙ্গে ভারত সরকারের এই চুক্তি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমেই মাত্র তিন মাসের মাথায় ভারত বাংলাদেশ থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। পৃথিবীর প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কোনও অঞ্চলে যুদ্ধপরবর্তী সময়ে এভাবে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটেনি। প্রকৃত অর্থে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে টেকসই করার ক্ষেত্রে এই চুক্তির বিশেষ ভূমিকা ছিল। মহলবিশেষ এতো বছর এটিকে একটি ‘গোলামি চুক্তি’ হিসেবে অপপ্রচার করলেও এই চুক্তির বারোটি (১২) অনুচ্ছেদের প্রতিটি অনুচ্ছেদই ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পরিচায়ক ও বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূলে। ভৌগোলিক সীমারেখা বিবেচনায় প্রতিবেশী কোনও ছোট রাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহৎ কোনও রাষ্ট্রের এই ধরনের আন্তরিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ চুক্তি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের স্বার্থ সম্পর্কিত বিষয়গুলোর বহুমাত্রিক দিক রয়েছে। দুই দেশের সম্পর্ককে একটি দীর্ঘ পথপরিক্রমা বলা যেতে পারে। একটি বা দুইটি চুক্তির মাধ্যমেই এই সম্পর্কের পূর্ণতা বা সার্বিকতা মূল্যায়ন করা যায় না। দুয়েকটি ছাড়া দ্বিপাক্ষিক প্রায় সব চুক্তিতেই বাংলাদেশের স্বার্থ বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। ইতোপূর্বে ভারতের সঙ্গে তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নদী সংক্রান্ত মোট পাঁচটি চুক্তি হয়েছিল। এর মধ্যে নদীর পানি বণ্টনের চুক্তি হয়েছিল মাত্র দুটি, যার একটি বাংলাদেশের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে করা হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর।
ফেনী নদীর পানি ব্যবহার সম্পর্কিত চুক্তি প্রসঙ্গে
এই সফরে পানি বণ্টনের যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেটি কনভেনশনাল পানি বণ্টন চুক্তি নয়। ত্রিপুরার সাব্রুম শহরের জন্য খাবার পানি হিসেবে ফেনী নদীর মোট পানি প্রবাহের মাত্র ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করা হবে, যা ফেনী নদীর শুষ্ক মৌসুমের পানি প্রবাহের মাত্র শূন্য দশমিক ২২ শতাংশ। আমি মনে করি, এই সমঝোতা স্মারক ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে যেসব চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে, তার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন আর ‘zero sum game principle’ কার্যকরী নয়। এর পরিবর্তে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন পৃথিবীব্যাপী ‘win-win principle’ কার্যকরী হচ্ছে। ‘zero sum game principle’ এর অর্থ হচ্ছে একজনের কিছু সুবিধা পাওয়াকে অন্য পক্ষের স্বার্থবিরোধী মনে করা হয়। অন্যদিকে, ‘win-win principle’-এর অর্থ হচ্ছে, এক পক্ষ কিছু সুবিধা পেলে অন্য পক্ষ তাতে মন খারাপ না করে তার নিজের স্বার্থটাই দেখা উচিত।
এলপিজি রফতানি প্রসঙ্গে
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় এলপিজি রফতানি নিয়ে যে অপপ্রচার হচ্ছে, সেটা নিয়ে কথা বলা দরকার। আমরা কোনও গ্যাস রফতানি করছি না। বাংলাদেশের দুটি বেসরকারি কোম্পানি বিদেশ থেকে এলপিজি আমদানি করে তার অংশবিশেষ সেখানে রফতানি করবে। আর সেটিও বাংলাদেশের এলপিজির চাহিদা মেটানোর পরই তারা রফতানি করবে। এই এলপিজি আমাদের দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস কিংবা আমদানিকৃত এলএনজি থেকে উৎপাদিত হচ্ছে না। এটি crude oil থেকে উৎপাদিত আমদানিকৃত এলপিজি। বাংলাদেশের দু’টি কোম্পানির পক্ষ থেকে ভারতে এলপিজি রফতানির বিষয়টি নিঃসন্দেহে অর্থনীতির অগ্রগতির সূচকে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হবে। এছাড়া, এলপিজির এই বাণিজ্য বাংলাদশে-ভারত সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এই জন্য যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতি অনুযায়ী আন্তঃরাষ্ট্রীয় জ্বালানি বাণিজ্য ভূ-রাজনীতিকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।
একইভাবে আমাদেরও জ্বালানির জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। আমাদের দেশের উত্তরাঞ্চলে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন করতে ভারতের নুমালীগড় রিফাইনারির শিলিগুড়ি টার্মিনাল থেকে বাংলাদেশের পার্বতীপুর পর্যন্ত ১৩০ কি.মি. দীর্ঘ ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। আমাদেরও ভারতের কাছ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করতে হচ্ছে। তাছাড়া, যেই ত্রিপুরার একটি শহরকে ফেনী নদী থেকে আমরা সামান্য খাবার পানি দিচ্ছি, তারা তাদের নিজস্ব গ্যাস পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সেই বিদ্যুৎ আমাদের দিচ্ছে। আর গ্যাস রফতানির যে কথা বলা হচ্ছে, সে প্রসঙ্গে কিছু বলা উচিত। গ্যাস রফতানি শেখ হাসিনার সরকার করতে দেয়নি, তাই আওয়ামী লীগকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে নির্বাচনে হারানো হয়েছিল। এই বিষয়ে পরবর্তী অংশে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে জাতীয় ও আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় ক্রসবর্ডার বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বাণিজ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম রাষ্ট্রনায়ক যিনি ‘এনার্জি ডিপ্লোমেসি’-কে আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক, উপ-আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক পর্যায়ে প্রধান্য দিয়ে আসছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে ভারত থেকে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ আনার জন্য ভেড়ামারায় যে ক্রসবর্ডার ইন্টারকানেকশন স্থাপিত হয়েছে, সেটি বাংলাদেশের জন্য একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এছাড়া ভারতের ত্রিপুরার সঙ্গে ক্রসবর্ডার ইন্টারকানেকশন স্থাপিত হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের মোট সরবরাহকৃত বিদ্যুতের ৭% (১১৬০ মেগাওয়াট) ভারত থেকে আসছে, যা দেশের উৎপাদিত বিদ্যুতের গড় মূল্যের তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী। এছাড়া ভারতের ঝাড়খণ্ড ও ত্রিপুরা থেকে যথাক্রমে ১৪৯৬ ও ৩৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎসহ মোট ১৮৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সরকার আশা করছে, ২০৪১ সাল নাগাদ আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্য ও রিজিওনাল গ্রিড থেকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ পাবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে শেখ হাসিনার সরকার জলবিদ্যুৎ সক্ষমতা সমৃদ্ধ ভুটান ও নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করছে। নেপালের সঙ্গে ইতোমধ্যে সমঝোতা স্মারক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভুটানের সঙ্গে চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। ভুটান ও নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের পৃথক পৃথক বিদ্যুৎ বাণিজ্যে ভারত অংশীদার হিসেবে থাকছে। এই বিদ্যুৎ আমদানিতে ভারতের সহযোগিতা প্রয়োজন। আমাদের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ক্রসবর্ডার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বর্পূণ ভূমিকা রয়েছে। তাই আমাদের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে ভারতের সার্বিক সহযোগিতা দরকার।
গ্যাস নিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দেশবিরোধী নীতি
আজকে আমাদের কেন এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে? বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ভ্রান্তনীতি ও দেশবিরোধী সিদ্ধান্তের কারণেই আজকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করা হচ্ছে। আপনাদের মনে আছে, ২০০৪/২০০৫ সালে মিয়ানমার থেকে স্বল্পমূল্যে পাইপলাইন গ্যাস আমদানির প্রস্তাব ছিল। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারতের মধ্যে এ বিষয়ে MOU স্বাক্ষরও হয়েছিল। ওই সময়ে দীর্ঘমেয়াদি পাইপলাইন প্রকল্প থেকে যে পরিমাণ গ্যাস পাওয়ার কথা ছিল, সেটি পাওয়া গেলে আজ আমাদের এভাবে এলএনজি আমদানি করতে হতো না। আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, ওই সময়ে বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পে অংশগ্রহণ করলে মিয়ানমার পরবর্তীতে রোহিঙ্গা ইস্যুর মতো একটি প্রকট মানবিক সংকট চাপিয়ে দেওয়ার মতো আচরণ আমাদের সঙ্গে করতে পারতো না। কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতি অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি আন্তঃরাষ্ট্রীয় জ্বালানি বাণিজ্য ভূ-রাজনীতিকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। খালেদা জিয়ার সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে মিয়ানমার থেকে গ্যাস পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করলেও ২০০১ সালে নির্বাচনের পর দেশের সীমিত গ্যাস সম্পদ বিদেশে রফতানির উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। কারণ নির্বাচনের পূর্বে গ্যাস রফতানির মুচলেকা দিয়ে বিএনপি-জামায়াত ষড়যন্ত্রমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল। অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০০ সালে জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে সীমিত জাতীয় সম্পদ গ্যাস রফতানির সিদ্ধান্তের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব ব্যবহারের জন্য গ্যাস মজুতের সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। দেশের স্বার্থে গৃহীত এই সিদ্ধান্তের কারণেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসতে দেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালের অক্টোবরে আওয়ামী লীগের প্রতিরোধের মুখে খালেদা জিয়ার সরকার ইতোপূর্বে তারই গৃহীত গ্যাস রফতানির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। অর্থাৎ জাতির পিতা যে গ্যাস সম্পদ আমাদের দিয়ে গিয়েছিলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা তথা সার্বিক উন্নয়নের জন্য সেই সম্পদ রক্ষা করেছিলেন তাঁরই কন্যা শেখ হাসিনা।
লেখক: সমন্বয়কারী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচন পরিচালনা কার্যালয়; সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ইশতেহার প্রণয়ন কমিটি, টিম লিডার, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ডাটাবেজ প্রোগ্রাম

কৃষককে ভর্তুকি দেওয়া ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন প্রসঙ্গে

বুধবার , ২ অক্টোবর, ২০১৯ at ৬:১৬ পূর্বাহ্ণ
চলতি বোরো মৌসুমে ধানচাল ও গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় প্রায় ১৬ লাখ টন। নির্ধারিত সময় ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সংগ্রহ করা গেছে ১৪ লাখ ৭৭ হাজার টন বা প্রায় ৯২ শতাংশ। বাকি ১ লাখ ৭৬ হাজার টন সংগ্রহে তাই বাড়ানো হচ্ছে সময়। যদিও এ মুহূর্তে সরকারের খাদ্য ভান্ডারে রেকর্ড প্রায় ১৯ লাখ টন মজুদ রয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অন্যান্য মৌসুমের চেয়ে এবার সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি ভালো। গমের সংগ্রহ সময় ৩০ জুন শেষ হলেও ধান-চালের সময় শেষ হয়েছে ৩১ আগস্ট। চলতি বোরো সংগ্রহ মৌসুমের শেষ দিন পর্যন্ত ধান সংগ্রহ হয়েছে ৩ লাখ ৬৯ হাজার টন বা ৯২ শতাংশের বেশি। সেদ্ধ চাল সংগ্রহ হয়েছে ৯ লাখ ৩৫ হাজার টন বা লক্ষ্যমাত্রার ৯৩ দশমিক ৫২ শতাংশ। তবে আতপ চাল সংগ্রহ বেশ পিছিয়ে রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার ৮৫ শতাংশ বা ১ লাখ ২৮ হাজার টন আতপ চাল সংগ্রহ করা গেছে। এছাড়া গম সংগ্রহ হয়েছে ৪৪ হাজার ১৫৮ টন, যা লক্ষ্যমাত্রার ৮৮ শতাংশ। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের এ প্রসঙ্গে বক্তব্য হলো, খাদ্যের রেকর্ড মজুদ থাকলেও চলতি বোরো মওসুমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে একটু পিছিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর। তবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সাত দিনের বিকল্প কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এ সময় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির জন্য চাল উত্তোলন হবে। এ চাল যেন সরকারি খাদ্যগুদামে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য আগামী সাতদিন কোনো ধরনের চাল বাজার থেকে কেনা হবে না। শুধু ধান কেনা হবে। পত্রিকান্তরে এ খবর প্রকাশিত হয় গত ৩ সেপ্টেম্বর।
খাদ্য মন্ত্রণালয় এবছরও ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। দেখা যাচ্ছে গণমাধ্যমে এমন খবর নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কেন সরকার প্রতিবছর লক্ষ্য অনুযায়ী ধান-চাল সংগ্রহ করতে পারছে না তার কারণ অজানাই থেকে যাচ্ছে। প্রথমেই উদ্দেশ্যগত সমস্যার বিষয়টি সামনে চলে আসে। সরকারের ধান চাল সংগ্রহের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে গুদামে মজুত বাড়ানো আপৎকালীন সমস্যা মেটানোই এর উদ্দেশ্য। আর পশ্চিমবঙ্গে ধান-চাল সংগ্রহ করা হয় কৃষককে সহায়তা করার জন্য। অর্থাৎ কৃষক সহায়ক কর্মসূচি। আমাদের সরকার ধান-চালের মজুদ বাড়াতে চাইলে অনেক পথ আছে। দরদামে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কিনতে পারে। সরকারের ধান-চাল সংগ্রহের দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যবস্থাপনা বদলাতে হবে। এখানে একটি কাজের পেছনে অনেকগুলো উদ্দেশ্য সাধনের চেষ্টা করা হয়। ফলে কোনটাই ঠিকমতো হয় না। একটি কাজের মধ্য দিয়ে একটি উদ্দেশ্য সাধন করা উচিত। তাছাড়া সরকার মধ্যস্বত্ব ভোগীদের কাছ থেকে অধিক হারে চাল কেনে। এ কার্যক্রম কৃষককে যৌক্তিক মূল্য প্রদানে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। আমরা প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগাতে পারি। তারা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে। সেখানে কোন মধ্যস্বত্বভোগী নেই। বাংলাদেশের খাদ্য অধিদপ্তরের বক্তব্য হলো, কৃষকের ধান ভিজা তা কেনা যায় না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার ভিজা ধান কেনে এবং শুকানোর ব্যবস্থা করে। আমাদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের পার্থক্য হলো, তারা কৃষকের কাছ থেকে কেনে আমরা কিনি মিল মালিকদের কাছ থেকে। আমাদের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একটি দল পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে সরজমিনে বিষয়টি দেখে আসতে পারে। আমাদের চাল কলের মালিকরা যদি কৃষকদের কাছ থেকে ভিজা ধান কিনে পরে তা শুকিয়ে নিতে পারেন, তাহলে সরকার কেন পারবে না। তার যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা সরকারের কাছ থেকে মিলছে না। ভারত সরকার কৃষককে আমাদের চেয়েও বেশি ভর্তুকি দেয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে ভাবতে হবে গভীরভাবে।

রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে


রবিবার , ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৯:২৮ পি,এম।
প্রধানমন্ত্রী কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনস এ গত বুধবার ‘এ কনভারসেশন উইথ অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার শেখ হাসিনা’ শীর্ষক একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণে শেখ হাসিনা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্বেচ্ছায় তাদের পৈত্রিক নিবাসে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে বিশ্ব সমপ্রদায়কে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যাটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা এই সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ ও তাৎক্ষণিক সমাধান চাই। মিয়ানমারই এই সমস্যার সৃষ্টি করেছে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই রয়েছে। তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে আশ্রয় প্রদানের ক্ষেত্রে আরেকটি যে বিষয় কাজ করেছে তা হচ্ছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশীদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার বিষয়টি। সে সময় বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি জনগণ প্রতিবেশী দেশ ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণে বাধ্য হয়েছিল। সন্ত্রাস এবং উগ্র চরমপন্থা নিয়ন্ত্রণে তাঁর সরকারের পদক্ষেপসমূহ তুলে ধরে সরকার প্রধান বলেন, আমাদের সরকার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করছে কেননা আমরা বিশ্বাস করি, সন্ত্রাসীদের কোন ধর্ম নেই, কোন সীমানা নেই। তিনি বলেন, আমরা আমাদের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে সজ্জিত করেছি এবং এর সঙ্গে সংযুক্তদের সমাজ থেকে পৃথক করার পদক্ষেপও গ্রহণ করেছি।
এর আগে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। এই ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে আছে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা যাতে নিরাপদে তাদের বাড়িঘরে ফিরতে পারে মিয়ানমারকে অবশ্যই সেই ব্যবস্থা করতে হবে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে রবার্ট মিলার রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরাতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মিয়ানমারকে অবশ্যই তাদের দেশে এসব মানুষকে নিরাপদ এবং সম্মানজনকভাবে ফিরিয়ে নিতে পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র প্রধান দাতা হিসেবে কাজ করছে। এরই মধ্যে ৫৫০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে।
এদিকে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে ওঠা রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে চার দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রোহিঙ্গা সমস্যার অনিশ্চয়তার বিষয়টি অনুধাবন করার জন্য শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান, কারণ এই সমস্যা এখন আর বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সকল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিষয়টি এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রমবর্ধমান স্থান সঙ্কট এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের কারণে এই এলাকার পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।’ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর চার দফা প্রস্তাব হচ্ছে: রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন এবং আত্মীকরণে মিয়ানমারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পূর্ণ প্রতিফলন দেখাতে হবে। বৈষম্যমূলক আইন ও রীতি বিলোপ করে মিয়ানমারের প্রতি রোহিঙ্গাদের আস্থা তৈরি করতে হবে এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের উত্তর রাখাইন সফরের আয়োজন করতে হবে। আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় হতে বেসামরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েনের মাধ্যমে মিয়ানমার কর্তৃক রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার ও সুরক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের অবশ্যই রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণসমূহ বিবেচনায় আনতে হবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যান্য নৃশংসতার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দশ লাখেরও বেশি মানুষ। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এ ঘটনায় খুঁজে পেয়েছে জাতিগত নিধন ও গণহত্যার আলামত। তবে এইসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। দেশটির গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী ও রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি’ও রোহিঙ্গাদের পক্ষে কোনও ইতিবাচক ভূমিকা নিতে সক্ষম হননি। বরং গণহত্যাকে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন তিনি। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিতেও কোনও উদ্যোগ নেননি সু চি। বরং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার কোনও অগ্রগতি না হওয়ার দায় বাংলাদেশের ওপর চাপিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয়ও অস্বীকার করে আসছেন তিনি।
আসলে, আমরা এমন একটি সমস্যার বোঝা বহন করে চলেছি যা মিয়ানমারের তৈরি। এটি সম্পূর্ণ মিয়ানমার এবং তার নিজস্ব নাগরিক রোহিঙ্গাদের মধ্যকার একটি সমস্যা। তাদের নিজেদেরই এর সমাধান করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সুরক্ষিত ও সম্মানের সঙ্গে স্বেচ্ছায় রাখাইনে নিজ গৃহে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান সম্ভব। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ জরুরি।
দৈনিক আজাদী

সংবাদপত্রের দর্পণ।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী


পাঠক মাত্রই স্বীকার করবেন সম্পাদকীয় পড়া সকলের হয় না। দৈনিক পত্রিকার সবচাইতে কমপঠিত অংশ বোধ করি তার সম্পাদকীয়। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে, অনেক বিজ্ঞাপনদাতা তো চোখে পড়িয়ে তবে ছাড়েন; আর খবর সে তো পড়বোই, কিন্তু সম্পাদকীয় যে দেখেও দেখি না, দেখলেও চোখ বুলিয়ে যাই মাত্র, ভাবটা এমন যে জানি কী লিখেছে, জানা আছে কী লিখতে পারে। এই যে না-পড়া এর কারণটা কী? পাঠকের অনীহা? নাকি পত্রিকারই দোষ, তারাই গুরুত্ব দেয় না তাদের সম্পাদকীয়কে, লিখতে হয় তাই লেখে, দায়সারা গোছের হয়, আকর্ষণ করে না পাঠককে?
আরও অনেক জিনিসের মতোই এক্ষেত্রেও দুটোই সত্য।
এবং দুটো পরস্পরবিচ্ছিন্ন নয়। পত্রিকা তার সম্পাদকীয়কে গুরুত্ব দেয় না, পাঠকও আগ্রহী হয় না সম্পাদকীয় পড়তে। পাঠক আগ্রহী হবে না জেনেই হয়তো সম্পাদক সম্পাদকীয় জিনিসটাকে গুরুত্ব দেন না।
চাহিদা নেই, সরবরাহ থাকবে কেন? দু’পক্ষই দায়ী বললাম, কিন্তু বক্তব্যটা বোধ করি ঠিক হলো না; পত্রিকার দায়িত্বটাই আসলে বেশি। কেননা সত্য তো এটাই যে, পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতার ওপর পত্রিকাকে নির্ভর করতে হয় বটে, কিন্তু পাঠকের তো সাধ্য নেই পত্রিকা সৃষ্টি করে, পত্রিকাই বরঞ্চ তার নিজের পাঠক নিজেই তৈরি করে নেয়; এবং কতটা ও কীভাবে পাঠক তৈরি করতে পারলো তার ওপরই পত্রিকার সার্থকতা নির্ভর করে।
পত্রিকায় আজকাল রং অনেক। বাংলা ভাষার যে-বিশেষ সম্পদ তার শব্দদ্বৈত, দুটো শব্দ একত্রে ব্যবহার, সেখানে দেখা যায় রং-এর সঙ্গে ঢং অনেক সময়েই এক সঙ্গে যায়। ওই দুটোই আছে; সংবাদপত্রে এখন রংঢং নানা প্রকারের, চোখ চলে যায় সেসব দৃশ্যে, সম্পাদকীয় থাকে নিতান্তই কোণঠাসা দশাতে। কিন্তু সংবাদপত্রের জন্য সম্পাদকীয় তো খুবই জরুরি। ব্যাপারটাকে কীভাবে বুঝাবো, কোন উপমা দিয়ে? বলবো কি সম্পাদকীয় হচ্ছে পত্রিকার ভরকেন্দ্র, যার ওপর পত্রিকা দাঁড়িয়ে থাকে? না, সেটা বললে অতিশয়োক্তি করা হবে। তাছাড়া পত্রিকাকে দালানকোঠা হিসেবে দেখাটা যে প্রীতিপ্রদ তাও নয়। গাছের যেমন কাণ্ড থাকতে হয়, নইলে ডালপালা লতাপাতা থাকবে কী করে; খবরের কাগজের জন্যও তেমনি সম্পাদকীয় হচ্ছে অত্যাবশ্যক, এমন উপমাও দাঁড়াবে না। সংবাদপত্রকে বৃক্ষ হিসেবেও আমরা দেখতে চাইবো না, বৃক্ষ থাকলে আবার অরণ্যও এসে যাবে, কানের সঙ্গে মাথার আবির্ভাবের মতোই। তাহলে কি বলবো সম্পাদকীয় হচ্ছে বোঁটার মতো? ফুল যেমন ফুটতেই পারে না, বৃন্ত না থাকলে, সংবাদপত্রও তেমনি সংবাদপত্রই নয় সম্পাদকীয়ের অনুপস্থিতিতে। সম্পাদকীয়কে সংবাদপত্রের মেরুদণ্ড বলা সঙ্গত কি না সেও এক জিজ্ঞাসা। এই যে সব উপমা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছি এর উদ্দেশ্যটা তো খুবই স্পষ্ট। সম্পাদকীয়ের গুরুত্ব অনুধাবন। কিন্তু এদের কোনোটা দিয়েই হয়তো সত্যের ঠিক কাছাকাছি পৌঁছানো গেলো না। তাহলে কি বলবো যে সংবাদপত্র যেহেতু পত্রই এক প্রকারের, তাই তার পেছনে চাই একজন লেখক, লেখক না-থাকলে লিখবেটা কে? কিন্তু ওটা বলার সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি উঠবে। সেটা এই যে, সংবাদপত্রকে পত্র বলা হয় ঠিকই, কিন্তু সে সংজ্ঞা অনুযায়ীই সংবাদপত্র, অর্থাৎ খবরের কাগজ, খবর তো লেখার ব্যাপার নয়, সংগ্রহের ব্যাপার এবং সেই সংগ্রহও কেউ একা করে না, অনেকে মিলে করে, কেউ থাকে প্রত্যক্ষে, অনেকেই রয়ে যায় অপ্রত্যক্ষে। তাহলে? তাহলে কোনো একজন বিশেষ সম্পাদকীয় লেখকের কথাটা আসে কোন যুক্তিতে?
যুক্তি অবশ্যই আছে। সেটা এই যে, সংবাদপত্র সংবাদই দেয়, কিন্তু প্রত্যেক সংবাদপত্রেরই একটা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। সংবাদপত্র কোনো যন্ত্র নয়। সে একটা জীবন্ত সত্তা। তার পেছনে তাই পরিকল্পনা, নীতি, আদর্শ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য সবকিছু থাকে। অর্থাৎ একটা কেন্দ্র থাকে, যাকে মস্তিষ্ক বলা যায়, আর ওই যে কেন্দ্র সেটা ধরা পড়ে সম্পাদকীয়তে। সম্পাদক ছাড়া যেমন পত্রিকা হয় না, সম্পাদকীয়বিহীন পত্রিকার তেমনি অসম্ভব-তা সে-সম্পাদকীয় যেভাবেই লিখিত হোক না কেন। কোনো পত্রিকা যদি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পাদকীয় নাও ছাপে তাহলেও বোঝা যাবে যে ওই না-লেখাটাই তার সম্পাদকীয় নীতি বটে, সম্পাদকীয়ের আকারে নির্দিষ্টভাবে যা লেখা হয়নি। সেই না-লেখা দৃষ্টিভঙ্গিটা পরিব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে সমগ্র পত্রিকাটি জুড়ে। লুকাবার উপায় নেই। কিন্তু আমি আনুষ্ঠানিক সম্পাদকীয়ের কথাই বলছি। সেটাই আমি পড়তে চাই। পড়তে চাই এই কারণে যে, যে-পত্রিকা আমি পড়ছি তাতে যেসব সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো কোন বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হয়েছে তা জানলে আমার জন্য সুবিধা হয়। দু’দিক থেকে। প্রথমত আমি বুঝতে পারি যে-পত্রিকাটির অঙ্গীকারটা কোন ধরনের এবং তার চিন্তাগুলো কেমন। দ্বিতীয়ত, আমি সম্পাদকীয় বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে ভাববার সুযোগ পাই। এই যে অঙ্গীকার ও চিন্তা, এই দুটোই কিন্তু খুব জরুরি। যেমন পত্রিকার জন্য তেমনি পাঠকের জন্য। পত্রিকাকে ওই অঙ্গীকার ও চিন্তা দিয়েই চেনা যায়, সেদিক থেকে মেরুদণ্ডের উপমাটি নিতান্ত অযথার্থ নয়।
সম্পাদকীয় পাঠকের জন্য উপকারী। এই যে এতসব খবর পত্রিকা দিচ্ছে এদেরকে কীভাবে মূল্যায়ন করবো, এদের পেছনকার পরিপ্রেক্ষিতটা কী, কী এদের তাৎপর্য এসব বুঝতে সম্পাদকীয় আমাকে সাহায্য করে। সংবাদপত্র আমি দ্রুত পড়ি, সেই দ্রুততার মধ্যে সম্পাদকীয় আমাকে কিছুটা হলেও সহায়তা দেয় সংবাদগুলো দেখে অভিভূত না-হয়ে তাদের অর্থ বুঝতে। সম্পাদকীয় দফতরের লোকেরা জানেন, খবর রাখে, পরামর্শ করেন, গবেষণাও বাদ দেন না; তাঁদের সেই কাজে পাঠক হিসেবে আমি আলোকিত হই।
কোনো সংবাদপত্রই নিরপেক্ষ নয়। হওয়া সম্ভবও নয়, উচিতও নয়। কেননা সব সংবাদের ভেতরই একটা দ্বন্দ্ব থাকে; আসলে ভেতরের দ্বন্দ্ব থেকেই বাইরের সংবাদটি তৈরি হয়। সংবাদপত্র সংবাদটি দেবে, বিভিন্ন ভাষ্য তুলে ধরবে, বস্তুনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করবে, কিন্তু তাকে অবশ্যই একটা অবস্থান থেকে দেখতে হবে খবরের ভেতরকার দ্বন্দ্বটিকে। সেখানে সে আর নিরপেক্ষ নয়। পাঠক হিসেবে বিশেষ বিশেষ সংবাদপত্রের এই অবস্থানটি আমি পছন্দ করতে পারি, আবার না-ও পারি। কিন্তু আমার জানা প্রয়োজন যে পত্রিকাটি কোন দিকে রয়েছে, তার কাছে আমার প্রত্যাশাটা কী এবং কতটা। সম্পাদকীয় আমাকে সাহায্য করে পত্রিকার অবস্থান জানতে।
খবরের কাগজের সাফল্য নির্ণয় করবার নিরিখ নিশ্চয়ই রয়েছে। সেটা কি? একটা নিরিখ তার জনপ্রিয়তা। আরেকটা নিরিখ তার আয়। আয় আবার জনপ্রিয়তার সঙ্গে জড়িত। বিক্রি থেকে আয় আসে। আসে বিজ্ঞাপন থেকেও; বিজ্ঞাপনও আবার নির্ভর করে পত্রিকার কাটতির ওপর। কিন্তু কেবল কাটতি দিয়ে সংবাদপত্রের যথার্থ মূল্য ঠিক করাটা অন্যায়। জনপ্রিয়তা লাভ অনেক কারণেই ঘটতে পারে। যেমন, অপরাধ জগতের রমরমা খবর। সেটা থাকলে কাগজ চলে ভালো। কিন্তু ওই রকমের ভালো কাগজকে ভালো কাগজ বলা হয় না। পত্রিকার চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করে তার গুরুত্বের ওপর। আর ওই গুরুত্বেরই একটা উৎস হচ্ছে সম্পাদকীয়। সম্পাদকীয়কে যখন গুরুত্ব দেওয়া হয়, তার দিকে যখন সরকার, পাঠক, নীতিনির্ধারকেরা তাকিয়ে থাকে তখন বোঝা যায় যে, পত্রিকাটি খুবই প্রভাবশালী। আর যদি পত্রিকা কি লিখলো না-লিখলো তাকে উপেক্ষা করা হয় তাহলে বুঝতে হবে সে বাসি হবার জন্যই ছাপা হয়, বরং বাসি হতে দেরি করে না। বড়ই হালকা সে, নিউজপ্রিন্টের মতো।
আমাদের দেশের সংবাপদপত্রের ইতিহাসে দেখবো যে, সেসব সংবাদ পত্রই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল যাদের সম্পাদকীয় নীতি ছিল স্পষ্ট ও দৃঢ়। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তার একটা কারণ তিনি একটি দৈনিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। ১৮৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ওই পত্রিকার নাম ছিল ‘দি বেঙ্গলি’।
১৮৮৩ সালে, অর্থাৎ প্রকাশের চার বছর পর সুরেন্দ্রনাথ কারাবন্দি হন পত্রিকায় সম্পাদকীয় লেখার জন্য। অভিযোগ ছিল আদালত অবমাননার। এটাই ছিল রাজনৈতিক কারণে একজন সম্পাদককে কারারুদ্ধ করার প্রথম ঘটনা। এ নিয়ে প্রবল আন্দোলন হয়, এবং সুরেন্দ্রনাথ মুক্তি পান। ১৯০৫ সালে স্বদেশী আন্দোলন শুরু হলে ‘দৈনিক বন্দেমাতরম’ পত্রিকার সম্পাদক অরবিন্দ ঘোষকে বন্দী করা হয়। সেও সম্পাদকীয় লেখার কারণেই। ওই আন্দোলনের কালে মওলানা আকরম খাঁ ‘দৈনিক সেবক’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন, তিনিও গ্রেফতার হন, ‘আপত্তিকর’ সম্পাদকীয় লেখার দায়ে, এবং এক বছর কারাদণ্ড ভোগ করেন। পরবর্তীতে আমরা দেখেছি রাজনীতিতে মওলানা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পেরেছেন তাঁর একটি কারণ হচ্ছে পত্রিকা সম্পাদনা। স্বদেশী আন্দোলনের সময়ে ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় অত্যন্ত সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেন, তিনিও রাজদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন তাঁর পত্রিকা ‘সন্ধ্যা’র সম্পাদকীয়ের কারণে। আদালত তাঁকে শাস্তি দিতে পারেনি, কেননা বিচার যখন চলছিল সেসময়েই তিনি প্রাণত্যাগ করেন। কিন্তু কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ঠিকই কারাভোগ করতে হয়েছিল, এর কয়েক বছর পরে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে নিজের অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু’তে বিদ্রোহাত্মক যে কবিতাটি লিখেছিলেন সেটা আসলে পত্রিকার সম্পাদকীয়ই ছিল।
আরেকটু পেছনের দিকে তাকালে দেখবো নীলকরদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে লেখার জন্য ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ পত্রিকা রাজরোষে পড়েছে। ‘যুগান্তর’ পত্রিকা থেকে অনেকটা অনুপ্রেরণা নিয়ে যুগান্তর দল নামে স্বদেশী বিপ্লবীদের একটি সংগঠনই দাঁড়িয়ে যায়। আর ওই পত্রিকায় লেখার জন্য হাস্যকৌতুকের রচয়িতা শিবরাম চক্রবর্তীকে পর্যন্ত একবার জেল খাটতে হয়েছিল।
পাকিস্তান আমলে দেখেছি ‘পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকার সম্পাদক আবদুস সালাম কারাভোগ করেছেন তথাকথিত আপত্তিকর সম্পাদকীয় লেখার দরুন। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে শুধু যে জেল খাটতে হয়েছে তা নয়, তাঁর পত্রিকা ও প্রেস সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ঘটনা অন্যরকম হবার কথা ছিল। কিন্তু হয় নি। সম্পাদকীয় রচনার কারণে আবদুস সালাম আবারও শাস্তিভোগ করেছেন, তাঁকে পদচ্যুত হতে হয়েছে। সাপ্তাহিক ‘হলিডে’ পত্রিকার এনায়েতুল্লাহ খানকেও আটক করা হয়েছিল। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের মুখপত্র ‘গণকণ্ঠে’র সম্পাদক কবি আল মাহমুদও বন্দী হয়েছিলেন সম্পাদক হিসেবে।
মোটকথা, সম্পাদকীয় যখন গুরুত্বপূর্ণ হয় তখন তাকে উপেক্ষা করা যায় না, উপায় থাকে না উপেক্ষা করবার। আর তাতেই বোঝা যায় সম্পাদকীয় জিনিসটা হালকা জিনিস নয়। কিন্তু অধিকাংশ পত্রিকাই যে এখন সম্পাদকীয়কে হালকাভাবে নেয় তার কারণটা কী? কারণ হচ্ছে অঙ্গীকার এবং চিন্তা দু’য়েরই অভাব। যেসব পত্রিকা সমকালে গুরুত্বপূর্ণ হয় এবং ইতিহাসে স্থান পায় তাদের ক্ষেত্রে ওই দু’টির কোনোটিরই অভাব ঘটে নি। বরঞ্চ অধিক পরিমাণেই ছিল। ইতিহাস তো তৈরি হচ্ছে, এবং সংবাদপত্র সেই চলমান ইতিহাসেরই সহযাত্রী দলিল। সে একটি দর্পণ ঠিকই, কিন্তু কেবল বহিরঙ্গের নয়, হওয়া চাই ভেতরেরও। যথার্থ দর্পণ সে হতে
পারবে কি পারবে না, এবং পারলেও কতটা হবে তা ধরা পড়ে সম্পাদকীয়তে। কেননা সম্পাদকীয় তো কেবল একটি বিচ্ছিন্ন রচনা নয়, কেবল যে দর্পণ তাও নয়, সে হচ্ছে গোটা পত্রিকার নিরিখ ও নির্দেশক। অন্য উপমা যেমন-তেমন নিরিখ ও নির্দেশকের উপমাকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কিন্তু এখন অঙ্গীকারগুলো বড় দুর্বল, চিন্তা বেশ অগভীর। সেই বাস্তবতাটা সম্পাদকীয়ের দুর্দশাতে যে ধরা পড়েছে তা অস্বীকার করা যাবে না। অঙ্গীকার ও চিন্তার ওই দ্বৈত ক্ষেত্রে পত্রিকার সঙ্গে পত্রিকার যে দ্বন্দ্ব সেটাও দেখি না। দ্বন্দ্ব থাকলে সম্পাদকীয়ের মান উঠতো, এবং তারা আকর্ষণীয় হতো। পত্রিকার সঙ্গে পত্রিকার প্রচণ্ড, প্রায় গলা-কাটা প্রতিযোগিতা চলছে। কিন্তু সেটা মতাদর্শিক নয়, বাণিজ্যিক বটে। মতাদর্শের ব্যাপারে চিন্তা, অঙ্গীকার ও দ্বন্দ্ব-তিনটিরই বড় অভাব আজ বাংলাদেশে। ওই অভাব আমাদেরকে এগুতে দিচ্ছে না। সংবাদপত্র এ ব্যাপারে আমাদেরকে অবশ্যই সাহায্য করতে পারে। কিন্তু করবে কি?
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্লাস্টিকের সর্বব্যাপী আগ্রাসন রুখতে উদ্যোগ নিতে হবে।

আফতাব চৌধুরী | প্রকাশের সময় : ৬ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০২ এএম


রান্নঘরের তেলের বোতল, পানির বোতল, মগ, বালতি, বিস্কুটের প্যাকেট, চায়ের প্যাকেট, মশলার প্যাকেট থেকে শুরু করে চেয়ার টেবিল, টুল, টেবিল, ঢাকনা, তালা, গ্লাস, বাটি, চামচ, টিফিন বক্স, ঘরের দরজা-জানালা, ইলিকট্রিক পাখা, ছাতারবাট, গায়ের বর্ষাতি, পায়ের চপ্পল, জুতো গাড়িতে বসার সিটের স্পঞ্জ, ফোম, ঢাকনা, কোথায় নেই প্লাস্টিক। আছে চশমার ফ্রেমে, কলমের শরীরে, কম্পিউটারে , ল্যাপটপে, শার্ট-পেন্টের বোতামে, চেনে, কোমরের বেল্টে, ঘড়ির বেল্টে, চিরুনিতে, হাতের স্টিকে, ঔষুধের প্যাকেটে, ঔষুধের বোতলে, ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জে, ছোট বড় পানির পাইপে।
বাংলাদেশ তো বটেই, বিশ্বময় ছড়িয়ে আছে প্লাস্টিক সামগ্রী বিভিন্ন আকৃতিতে, বিভিন্ন প্রকৃতিতে। প্রতি বছর ত্রিশ কোটি মেট্রিক টনেরও বেশি প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরী হচ্ছে পৃথিবীতে। এক হিসেবে দেখো গেছে, গত এক দশকে বিশ্বে যত প্লাস্টিক দ্রব্য তৈরি হয়েছে, তার আগের একশো বছরেও তা হয়নি।
প্লাস্টিক পণ্য ওজনে হালকা, বহনে সহজ, প্রয়োজনে সহজেই যত্রতত্র নিয়ে ব্যবহার করা যায়, দামেও সস্তা। পলিথিনের একটি ছোট্ট প্যাকেট ভাঁজ করে বুক পকেটে পুরে সাহেব সেজে বাজারে গিয়ে দুই-তিন কেজি ওজনের শাক-সবজি বা মালপত্র নিয়ে সহজেই বাড়ি ফেরা যায়। এইভাবে হাজার রকমের সুবিধা রয়েছে প্লাস্টিক সামগ্রী ব্যবহারে। তাই এই যুগকে প্লাস্টি যুগ বললে নিশ্চয়ই বেশি বলা হবে না। অবশ্য ইতিহাসের লৌহ যুগ বা তা¤্রযুগের মত প্লাস্টিক যুগ কিন্তু মানবসভ্যতার অগ্রগতির নিশান উড়িয়ে যাচ্ছে না মোটেই বরং বিপরীত কাজটি করে যাচ্ছে অহরহ।
প্লাস্টিক শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘প্লাস্টিকস’, থেকে। প্লাস্টিকস-এর অর্থ ছাঁচে ফেলা বস্তু। সহজ করে বলা যায়, ছাঁচে ফেলে ইচ্ছামতো আকৃতি দিয়ে বানানো বস্তু। আরও সহজ করে হয়তো বলা যাবে যে, বস্তুকে ছাঁচে ফেলে ইচ্ছামতো আকৃতি দিয়ে পছন্দের দ্রব্যটি বানিয়ে নেওয়া। উপরে উল্লেখিত দ্রব্যসামগ্রীর প্রতি একটু মনোযোগ দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেব।
রাসায়নিক বিচারে প্লাস্টিক একটি পলিমার। পলি শব্দের অর্থ বহু, মার শব্দের অর্থ একক। অর্থাৎ কোনো বস্তুর একককে রাসায়নিকভাবে বহু সংখ্যায় যুক্ত করে নিজে তাকে বড় আকার দেওয়া। আবার একটি মাত্র বস্তুর একক ব্যবহার করে কিন্তু প্লাস্টিকের যাবতীয় দ্রব্য তৈরি হচ্ছে না। অনেকগুলো বস্তুর একক ভিন্ন ভিন্ন দ্রব্যের প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এইসব বস্তুর মধ্যে আছে ইথলিন, প্রোপাইলিন, বিউটেন, স্টাইরিন ইত্যাদি। কী বস্তুটি বানানো হবে, সেই বিচারেই ববহৃত বস্তু নির্বাচন করা হয়। আবার বস্তুটির সাথে মনমতো রং মিশিয়ে বানানো বস্তুটির রং দেওয়া হয়।
প্লাস্টিক মূলত খনিজ তেল, অর্থাৎ পেট্রোলিয়াম থেকে প্রস্তুত করা একটি বস্তু। যাঁদের বয়স পঞ্চাশ-ষাট বছর বা তার থেকে বেশি, তাঁরা নিশ্চয়ই মনে করতে পারবেন, তাঁদের ছোটবেলায় প্লাস্টিক সামগ্রীর এমন ছড়াছড়ি ছিল না কোথাও। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর মাটির নিচে প্রকান্ড সব খনিজ তেলের ভান্ডার আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকেই প্লাস্টিকের তৈরি সামগ্রী বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।
খনিজ গ্যাস থেকেও প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুত করা হয়। আবার একশো বছর আগেও প্লাস্টিকের দ্রব্য প্রস্তুত করা হত। কিন্তু তার পরিমাণ ছিল নিতান্তই স্বল্প। সেই পরিমাণ ধর্তব্যের মধ্যে ছিল না। কিন্তু এখন গোটা চেহারাটাই পালটে গেছে। একটি হিসাবে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত এক হাজার কোটি মেট্রিক টনেরও বেশি প্লাস্টিক দ্রব্য রয়েছে পৃথিবীতে। ব্যবহারের পরে এসব সামগ্রীর প্রায় সাড়ে ছ’শো কোটি মেট্রিক টন বর্জ্য হিসাবে ছড়িয়ে আাছে কৃষিক্ষেত্রে, রাস্তার পাশে, নালা-নর্দমায়, খাল-বিলে,নদ-নদীতে,সাগরে-মহাসাগরে। এমনকি, হিমালয় পর্বতের সর্বোচ্চ চূড়া এভারেস্ট শৃঙ্গেও। প্লাস্টিক কিন্তু পচে না বা সহজে নষ্ট হয় না। শত শত বছর, এমনকি হাজার বছরেরও বেশি সময় অবিকৃত থেকে যায়। আবার প্লাস্টিক পোড়ালে প্লাস্টিক থেকে বিষাক্ত কিছু গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে । এইসব গ্যাসের মধ্যে আছে ডাই-অক্সিন, হাইড্রোজেন ক্লোরাইড ইত্যাদি। এইসব গ্যাস ক্যানসার রোগ সৃষ্টিতে বা এই রোগের বৃদ্ধিতে সহায়কের কাজ করে। আবার যেসব দ্রব্যের একক থেকে বিভিন্ন প্রকারের প্লাস্টিক দ্রব্য তৈরি হয়, সেইসব দ্রব্যও ক্যানসার রোগ সৃষ্টিতে বা ওই রোগ বৃদ্ধিতে সহায়কের কাজ করে। তাই প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি কোন আধারে খাবার বস্তু রাখা একেবারেই ঠিক নয়।
যেসব প্লাস্টিক দ্রব্য জলে, স্থলে বর্জ্য হিসাবে ছড়িয়ে আছে, সেইসব বর্জ্য থেকেও বিষাক্ত উপাদান ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। অথচ বিশ্বে এখন কোটি কোটি মেট্রিক টন প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। ব্যবহারের পর তার বৃহৎ অংশই ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের সর্বত্র। অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন যে হারে প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রের পানিতে ফেলা হচ্ছে, এই হার বজায় থাকলে আগামী পঁচিশ তিরিশ বছরে তার সংখ্যা সমুদ্রের জলজ প্রাণীর সংখ্যা থেকে বেশি হয়ে যাবে।স্থলভাগেও প্লাস্টিক বর্জ্যরে পরিমাণ দিন দিন বৃৃদ্ধি পাচ্ছে। কি ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি করে যাচ্ছি আমরা, বুদ্ধিমান মানুষেরা।
গঠনগতভাবে প্লাস্টিক পচে না বা নষ্ট হয়ে যায় না। কিন্তু দীর্ঘদিন রৌদ্র বা বৃষ্টিতে থাকলে, বিশেষ করে সূর্যদেহ থেকে আসা অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে প্লাস্টিক কিন্তু ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এইসব টুকরো ছোট থেকে বড় সব মাপেরই হয়। যেসব টুকরো আকারে পাঁচ মিলিমিটার থেকে ছোট,সেইসব টুকরোকে মাইক্রো প্লাস্টিক বলা হয়। মাইক্রো প্লাস্টিকের একটি ভাগ আকারে এতই ছোট যে, খালি চোখে তাদের দেখাই যায় না। এইসব অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিকের টুকরো বিভিন্ন উপায়ে খাদ্যশৃঙ্খলে ও পানীয় জলে মিশে যায়। মাইক্রো প্লাস্টিকের উপস্থিতি বোতলবন্দি মিনারেল ওয়াটারেও পাওয়া যায়। এ এক বিপজ্জনক অবস্থা।আগেই বলা হয়েছে, প্লাস্টিক ক্যানসার রোগ সৃষ্টিতে বা এই রোগ বৃদ্ধিতে আরো সহায়ক হয়ে ওঠে। আরও কিছু রোগ সৃষ্টিতে বা বৃদ্ধিতেও প্লাস্টিকের ভূমিকা রয়েছে। শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, স্থলজ ও জলজ সব প্রাণীর ক্ষেত্রেই তা সমানভাবে প্রযোজ্য। এই বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় কিন্তু আজও পাওয়া যায়নি। আবার জলজ অনেক প্রাণী এসব প্লাস্টিকের টুকরো খাদ্য ভেবে ভুল করে খেয়ে নেয়। এই প্লাস্টিক কিন্তু কোনোভাবেই প্রাণীর হজম প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় না। ফলে তা প্রাণীদের দেহে আবিকৃত অবস্থায় থেকে যায় এবং যতদিন যায়, তার পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফল হয় মারাত্মক। অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিমি বা ওই ধরনের বড় জলজ প্রাণী শুধু প্লাস্টিক, মাইক্রো প্লাস্টিকই নয়, ম্যাক্রো প্লাস্টিক বা আকারে পাঁচ মিলিগ্রাম থেকে শুরু করে অনেক বড় মাপের হয়, খাদ্য ভেবে ভুল করে খেয়ে নেয়। ফলে একই পরিণতি ঘটে তাদের ক্ষেত্রেও।এমন ও দেখা গেছে প্লাস্টিক খেয়ে মৃত তিমি বা ওই জাতীয় বড় জলজ প্রাণীর পেটে দশ, বিশ বা তার থেকেও বেশি কেজি ওজনের প্লাস্টিক রয়েছে। আমাদের কারণে কী মর্মান্তিক পরিণতি ঘটছে ওইসব অসহায় প্রাণীদের। অন্যদিকে, ব্যবহার করা মাছ ধরা জালের যে খন্ডাংশ সমুদ্রের পানিতে অবলীলায় ফেলে দেওয়া হয়, তাতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে, চলচ্ছক্তিহীন হয়ে তিমি, কচ্ছপ প্রভৃতি জলজ প্রাণী একইভাবে মৃত্যুবরণ করছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সমুদ্রতলে কোনো কোনো অঞ্চলে কার্পেটের মত জড়িয়ে আছে প্লাস্টিকের ছোট বড় টুকরোগুলোই। ফলে শেওলা জাতীয় ক্ষুদ্র উদ্ভিদের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এই শেওলা খেয়েই ছোট মাছেরা জীবনধারণ করে। আর ক্ষুদ্র মাছেদের খেয়ে বড় মাছেরা বেঁচে থাকে। ফলে মাছেদের বৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হয়। মাছকে খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে মানুষ। ফলে মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সমুদ্রের পানির কোরাল জগৎ সৌন্দর্যের এক অপার লীলাভূমি। কোরাল জগতের মোহময় বর্ণবৈচিত্র, সৌন্দর্যপিপাসু মানুষদের মনকে সহজেই আকৃষ্ট করে। বিশ্বের উষ্ণম্ডলীয় অনেক দেশের সমুদ্রের পানিতে এই কোরাল জগৎ রয়েছে। কোরাল জগতের সৌন্দর্য উপভোগ কারার জন্য প্রতি বছর বিশ্বের হাজার হাজার পর্যটক কোরাল ক্ষেত্রগুলোতে ভিড় জমান। কোরাল জগৎ শুধু তার অপার সৌন্দর্যের জন্যই বিখ্যাত হয়ে ওঠেনি। কোরাল রিফ সমুদ্রের ঢেউ থেকে সমুদ্রোপকূলকে রক্ষা করার কাজেও সাহায্য করে। তাছাড়া কোরাল রিফ অসংখ্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থলও বটে। তাদের জীবনচক্র কোরাল রিফকে আশ্রয় করেই গড়ে ওঠে এবং এই রিফেই পূর্ণতা লাভ করে। অন্যান্যা কিছু কারণসহ সমদ্রের পানির প্লাস্টিকও এই কোরাল জগৎকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এমনকি, কোনো কোনো অঞ্চলের কোরাল শ্রেণি ইতিমধ্যে হয় ধ্বংস হয়ে গেছে, নয়তো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের খ্যাতি বিশ্বময় ছড়িয়ে আছে। এই রিফও আজ ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
প্লাস্টিক সমুদ্র পানির বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের সাথে বিক্রিয়া ঘটিয়ে কিছু বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করে। এসব বিষাক্ত পদার্থই সংবেদনশীল কোরাল প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আরেকটি কারণ হল, সমুদ্র পানিতে ভেসে চলা ছোট-বড় প্লাস্টিকের অসংখ্য টুকরো কোরাল শ্রেণিতে আটকা পড়ে যায়। এসব প্লাস্টিকের টুকরো দিনের পর দিন কোরালের গায়ে লেগে থাকে।
দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে সম্পূর্ণ জনমানববর্জিত ছোট্ট বিন্দুর মতো একরত্তি একটি দ্বীপ হেন্ডারসন আইল্যান্ড। আয়তনে ম্যনহাটন শহরের আধা এই ছোট্ট দ্বীপটির অন্তত তিন হাজার মাইলের মধ্যে কোনো মনুষ্যবসতি নেই। অথচ, কী আশ্চর্য, হেন্ডারসন দ্বীপের তটরেখা জুড়ে ছড়িয়ে থাকতে দেখা গেল ১৯ টন বর্জ্য। দ্বীপময় ছড়িয়ে আছে কম করে ৩ কোটি ৭০ লক্ষ নানা আয়তনের প্লাস্টিকের টুকরো। হিসাব করলে দাঁড়ায় প্রতি বর্গমিটারে প্রায় ৬৭২টি প্লাস্টিক বর্জ্যরে টুকরো। এই দ্বীপে এল কোথা থেকে এত প্লাস্টিক? সন্দেহ নেই, আমাদের মতো সমুদ্রনিকটতবর্তী দেশগুলো থেকেই প্লাস্টিক বর্জ্য প্রথমে এসে পৌঁছায় সমুদ্রে আর তারপর স্রোতের ঘূর্ণিপাকে ঢেউয়ের ধাক্কায় ধাক্কায়, তার ভবিতব্য হয় হেন্ডারসনের মতো একফালি দ্বীপ অথবা সমুদ্রেই তা থেকে যায় অনন্তকালের জন্য। কাচের বোতল সমুদ্রে অক্ষত থাকে, প্রায় হাজার চারেক বছর। কিন্তু কোনো কোনো প্লাস্টিকের বোতল অক্ষত থেকে যেতে পারে আদি থেকে অনন্তকাল। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লক্ষ টন প্লাস্টিকের অন্তিম আশ্রয় সমুদ্র। আর এর বড় অংশই সমুদ্রে আসে দূষিত নদীগুলোর মাধ্যমে। সমুদ্রে এসে পৌঁছানো প্লাস্টিকের দুই-তৃতীয়াংশেই বয়ে নিয়ে আসে বিশ্বের ২০টি সর্বাধিক দূষিত নদী, যার মধ্যে চীনের ইয়াংসি, ইন্দোনেশিয়ার প্যাসিগ আর আমাদের পদ্মা সমেত ১৫টি এশিয়ার। এই বিপুল পরিমাণ অক্ষয়, অভঙ্গুর প্লাস্টিকের বড়, ছোট এমনকি আনুবীক্ষণিক টুকরোর দূষণে একাধিক বিপন্ন প্রজাতিসহ প্রায় ২২৭০টি সামুদ্রিক প্রজাতি সরাসারি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। খুব সম্প্রতি ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী এথেন্সকেন্দ্রিক পেলাগোজ কেটাসিয়ান রিসার্চ ইন্সটিটিউটের গবেষকরা গ্রিসের সমুদ্রে স্পার্ম হোয়েল প্রজাতির মৃত তিমিরের প্রায় প্রত্যেকের পাকস্থলীতে প্রচুর পরিমাণে প্লাস্টিক পেয়েছেন। গত জানুয়রিতেও একই ভাবে উত্তর সাগরের তীরভূমিতে এসে মারা যাওয়া ২৯টি তিমির সুরতহাল করতে গিয়ে তাদের পেটেও পাওয়া গিয়েছিল দলা পাকানো বড় বড় প্লাস্টিকের টুকরো। যেসব সামুদ্রিক মাছ আমরা খাই, তার মাধ্যমে আমাদের দেহেও সবার অলক্ষ্যে প্রতিদিন ঢুকে পড়ছে আণবীক্ষণিক প্লাস্টিক তন্ত বা মাইক্রোপ্লাস্টিক চিপস।
ইউসি ডেভিস সম্প্রতি দেখিয়েছেন, ইন্দোনেশিয়া ও ক্যালেফোর্নিয়ায় মাছের বাজারে বিক্রি হওয়া মাছের অন্তত ২৫ শতাংশের দেহে পাওয়া গেছে প্লাস্টিক অবশেষ। কিন্তু শুধু সমুদ্রই নয়, কৃষিজমি থেকে পানিসেচ, এমনকি পানীয় জল পর্যন্ত আজ প্লাস্টিক দূষণের কবলে। গত বছর সেপ্টেম্বরে আমেরিকার মিনসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক কাম্পালা, দিল্লি, জাকার্তা, ইউরোপের সাতটি ও মার্কিন মুলুকের একাধিক শহর থেকে মোট ১২৯টি কলের পানির নমুনা পরীক্ষা করে ৮৩ শতাংশ নমুনাতেই প্লাস্টিকের অতিক্ষুদ্র আণুবীক্ষণিক তন্তর অস্তিত্বের প্রমাণ পান।
শুধু পানিভাগেই নয়, স্থলভাগেও প্লাস্টিক নানাভাবে দূষণ ছড়িয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। এই দূষণের ফলে মানুষসহ স্থলজ সকল প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষিক্ষেত্রে প্লাস্টিকের উপস্থিতি কৃষিজাত শস্যের ফলনে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। বর্ষার মরশুমে শহরাঞ্চলের নালা-নর্দমায় জমে থাকা প্লাস্টিক রাস্তায় পানি জমার কারণ হয়ে উঠছে। বর্ষব্যাপী নালা-নর্দমায়, রাস্তাঘাটে, বাড়ির আনাচে-কানাচে ফেলে রাখা প্লাস্টিকের গায়ে আটকে থাকা পানিতে মশার বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করছে। বায়ুমন্ডলেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা ভীষণভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এইসব কণা শ্বাসক্রিয়ার সাথে জীবদেহে প্রবেশ করে জীবদেহের ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

তরুণদের সুযোগ দিন

বর্তমান তরুণ প্রজন্ম কাজে বিশ্বাস করে, কথায় নয়। বড় কষ্ট লাগে যখন দেখি, আমাদের দেশে তরুণ বেকারের সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অধিক। এই বেকার তরুণদের মাধ্যমে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। এদের চিন্তাচেতনা আর বুদ্ধি যদি কাজে লাগাতে পারে রাষ্ট্র, তবে বাংলাদেশ পরিণত হবে সোনার বাংলায়। বর্তমান তরুণ সমাজ এটাই চায়। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে তরুণ সমাজের বিকল্প নেই। একটা কথা সবার মনে রাখতে হবে, আজকের তরুণরাই আগামী দিনে দেশ পরিচালনা এবং বড় বড় কাজের নেতৃত্ব দেবে। এখন থেকে যদি তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তোলা যায়, তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আরও সুন্দর হবে। তাই দেশ গঠনে তরুণদের চাওয়াকে যেমন গুরুত্ব দিতে হবে, ঠিক তেমনি তাদের পর্যাপ্ত সুযোগও দিতে হবে। আজ দেশে লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার তরুণ যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যাদের চাইলে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারে সরকার। তরুণদের দাবি একটাই, পর্যাপ্ত পরিমাণ কর্মসংস্থান। দেশে যেন বেকার না থাকে। মনে রাখতে হবে, সরকারের প্রধান যিনিই হন না কেন, তরুণদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করলেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন।
আজহার মাহমুদ,চট্টগ্রাম।

নকল-ভেজাল ওষুধের ছড়াছড়ি।

কামরুল হাসান | প্রকাশের সময় : ৮ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০৪ এএম
প্রতিটা মানুষ চায় সুস্থতার সাথে বেঁচে থাকতে। আর এই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্যই আমাদের জীবনের সাথে চলে আসল যুদ্ধ। আমরা অসুস্থ হওয়ার সাথে সাথে সুস্থ হতে মরিয়া হয়ে উঠি এবং চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হই এবং ওষুধ সেবন করে থাকি। আর বেঁচে থাকা এবং সুস্থ থাকার সংগ্রামে রোগ নিরাময়কারী ওষুধ যদি হয় ভেজাল, নকল এবং মানহীন তাহলে কীভাবে সুস্থ থাকা সম্ভব? ভেজাল ওষুধ কতটা মারাত্বক হতে পারে এ বিষয়ে মোটামুটি সবাই অবগত। ধরা যাক, আপনার কোনো সংক্রামক রোগ হয়েছে। সেক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার অপরিসীম। জীবাণু দ্বারা দেহের কোনো অঙ্গ-প্রতঙ্গ আক্রান্ত হলে জীবাণু টিকে থাকার জন্য যুদ্ধ শুরু করে। এই ক্ষেত্রে শরীর তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মাধ্যমে বা অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠার জন্য জীবাণু ধ্বংস করার কাজ করে। দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে বা নষ্ট হয়ে গেলে এবং উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা না হলে জীবাণু দেহকে ধ্বংস করার কাজে লেগে যায়। এর মানে হলো, মারাত্বকভাবে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে যে পরিমাণ নকল ওষুধ উৎপাদন, মেয়াদহীন ওষুধ পুনঃ প্যাকেটজাতকরণ এবং ভেজাল ওষুধের সয়লাব দেখা যায় তা পৃথিবীর আর কোনো দেশে দেখা যায় না। যে সকল ওষুধ আসল নয় বা সঠিক কাঁচামাল দিয়ে তৈরি নয় সেটাই ভেজাল বা নকল ওষুধ। যে ওষুধ সঠিক কাঁচামাল ছাড়া, মান-নিয়ন্ত্রণহীনভাবে তৈরি করা হয় সেটাই হলো নকল ওষুধ। উৎপাদন এবং এই ওষুধ যখন মানুষের দোড়-গোড়ায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয় তখন সেই পদ্ধতিকে বলা হয় নকল ওষুধ বাজারজাতকরণ। তবে এটা সত্য যে, আমাদের দেশ ছাড়াও প্রায় সকল দেশেই নকল ও ভেজাল ওষুধ কম হলেও কিছুটা পাওয়া যায়। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো পাকিস্তান, ভারত, ল্যাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকা। পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায় , বিশে^র উৎপাদিত প্রায় ১৫ শতাংশ ওষুধে ভেজাল রয়েছে, যার মাঝে এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে এর পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যানে বাংলাদেশেও কম নয়, ১৯৮০ থেকে ১৯৮২ সাল নাগাদ ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে কয়েক হাজার শিশুর মৃত্যু হয়েছিল, যা সরকাররে ওষুধ প্রসাশনের মতে, দুই হাজারের অধিক হয়েছিল। আবার ২০০৯ সালের মাঝামাঝিতে শুধুমাত্র ভেজাল প্যারাসিটামল ওষুধ সেবনে ২৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল।
আসল ওষুধ উৎপাদনের বদলে নকল ওষুধ উৎপাদনকারী বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে বাংলাদেশে। তা আরো দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে আইনের সঠিকভাবে প্রয়োগ না হওয়ার কারণে। আইনশৃংখলা বাহিনী হাতে গোনা কিছু ওষুধ বিক্রেতা ও কিছু প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় এনে জরিমানা করে ছেড়ে দিচ্ছে, আবার কিছু মামলাও হচ্ছে। কিন্তু প্রতিকার নেই। কারণ, ঐসকল অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ী সাময়িকের জন্য থেমে থাকলেও পুনঃরায় একই পথ অবলম্বন করে।
দিন দিন প্রশস্ত হচ্ছে নকল, ভেজাল ওষুধের বাজার। এর অনেক কারণ সহজেই লক্ষযোগ্য। কিছু প্রধান কারণ উল্লেখ করতে চাই। (১) ইন্টারনেটের ব্যবহার জীবন চলার পথকে যেমন সহজ করেছে; সেই সাথে ইন্টারনেটের মারাত্বক অপকার রয়েছে। এই ইন্টারনেটকে কাজে লাগিয়ে অনলাইন ভিত্তিক কিছু প্রতিষ্ঠান ভেজাল ওষুধ সরাসরি ক্রেতার হাতে পৌঁছে দিচ্ছে। (২) রাস্তার আশে পাশে, ছোট-বড় হাট-বাজারে ছত্রাকের মতো গড়ে উঠা কিছু ওষুধের দোকান নকল ওষুধ বিক্রয়ের মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে নকল ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে। (৩) তথ্যমতে, দেশে প্রায় ২৫-২৬ হাজার রকমের ওষুধ তৈরি হয়, যার মধ্যে সরকার মাত্র ৪ হাজার রকমের ওষুধ পরীক্ষা করে দেখতে পারে। ফলে ভেজাল, নকল এবং নিম্নমানের ওষুধ ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়ছে দেশের সব জায়গায়। আর এভাবেই ধীরে ধীরে যেমন বাড়ছে ভেজাল ওষুধের বাজার; তেমনি মানুষের মৃত্যু ঝুঁকিও পাল্লা দিয়ে বেড়ে যাচ্ছে।
দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভেজাল, নকল ওষুধের পরিসংখ্যান বেশি। দেশের মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ কম হলে দেখা যায় নিম্ন থেকে মধ্যম আয়ের মানুষ কঠিন রোগেও দামী ওষুধ কেনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মুনাফালিপ্সু কিছু মানুষ কম দামে ভেজাল ওষুধ ছড়িয়ে দেয়। তাই ভেজাল, নকল ওষুধের ব্যাপারে সরকারের আরো সজাগ হতে হবে। তেমনি সচেতন হতে হবে প্রতিটা মানুষকে। চীনে ওষুধ এবং খাদ্য দ্রব্যে ভেজাল মিশালে মৃত্যুদন্ডের বিধান আছে। যদিও আমাদের বাংলাদেশে সেটা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবে আমরা দেশের জনগণ যদি নকল, ভেজাল ওষুধ চিনতে পারি, তাহলে ভোক্তা অধিকার আইনে মামলা করার সুযোগ পাবো। সুতরাং আমরা চেষ্টা করলে কিছু নিয়মে নকল ওষুধ চিনতে পারবো। যেমন, ১. ওষুধ কেনার সময় ওষুধের গায়ে যে সিল থাকে সেটি ভালো করে খেয়াল করতে হবে। কোনো প্রকার গলদ মনে হলে সে ওষুধ এড়িয়ে চলা ভালো। প্রয়োজনে অন্য কোনো দোকান থেকে ওষুধ কিনতে হবে। ২. আপনি যে ওষুধ খাচ্ছেন তা পরের বার কেনার সময় একই ওষুধ কিনা খালি লেভেলের সাথে মিলিয়ে কেনা ভালো। তাতে নকল ওষুধ কিনা কিছুটা হলেও যাচাই করতে পারবেন। ৩. ওষুধ কেনার সময় দাম একটি বড় ব্যাপার। দাম কম বেশি বা গড়মিল মনে হলে সে ওষুধ এড়িয়ে যাওয়া ভালো। নকল, ভেজাল ওষুধের দাম কম হয়ে থাকে। ৪. ওষুধের প্যাকেটে উৎপাদন এবং মেয়াদ দেখে নিন। ৫. আমাদের দেশে প্যানাসিয়া ডট লাইভ নামে একটি ওয়েব সাইট আছে। সেখানেও আপনার ওষুধটি সঠিক কিনা যাচাই করতে পারেন।
পরিশেষে শুধু বলতে চাই, যারা ভেজাল, নকল ওষুধ তৈরি করছে তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তির আওতায় আনা খুবই জরুরি। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশে ১৯৪০ সালের ড্রাগ অ্যাক্ট বা ওষুধ আইন বলবৎ আছে। এ আইনের আওতায় যে শাস্তির কথা বলা হয়েছে তা খুবই নগন্য। অপরাধের তুলনায় শাস্তির মাত্রা এতই কম যে তাতে অপরাধ ও অপরাধীর ওপর তেমন কোনো প্রভাব পড়ছে না। নকল, ভেজাল ও ক্ষতিকর ওষুধ উৎপাদন ও বিক্রি করার মাধ্যমে মানুষ হত্যার শাস্তি এক বা দুই লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে এক, দুই বা তিন মাস জেল গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে আইনকানুন পরিবর্তন করে আরো কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে, যাতে করে আর কেউ কোনো সময় নকল, ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করার সাহস না পায়। সেই সাথে দেশের সকল ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত ওষুধ ও প্রতিষ্ঠানকে ওষুধ প্রশাসনের নজরে আনতে হবে।
লেখক: আইনজীবী এবং কলামিস্ট

রাজধানীর এই অচলাবস্থার নিরসন হবে কবে।

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ১১ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০৩ এএম গত সপ্তাহে বৃষ্টিতে ঢাকা শহরের কী অবস্থা হয়েছে তা সকলেরই জানা। মতিঝিল, ফকিরাপুল, শান্তিনগর, ধানমন্ডিসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো হাঁটু ও কোমর সমান পানিতে তলিয়ে যায়। এমনকি প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ও পানি ঢুকে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। মনে হয় রাজধানী যেন পানিতে ভাসছে। কারুকাজ সমৃদ্ধ ভবনগুলো যেন পানির তলদেশ থেকে গড়ে তোলা হয়েছে। যানবাহনগুলো ডুবে ডুবে চলছে। অনেক যানবাহন অচল হয়ে পানির মধ্যেই ভাসতে থাকে। সব দেখে মনে হচ্ছে, রাজধানীতে এখন উভচর যানবাহন নামানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। গত সপ্তাহে কয়েক ঘন্টার বৃষ্টিতে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। বৃষ্টি এক-দুই ঘন্টা হলেও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে থাকা সড়ক থেকে পানি নামতে লেগে যায় পাঁচ-ছয় ঘন্টা। এ এক ভয়াবহ দৃশ্য। এ চিত্র দেখে বোঝার উপায় নেই এটি কোনো রাজধানীর দৃশ্য। মনে হবে, বর্ষার পানিতে নিমজ্জিত গ্রামীণ কোন জনপদ। বিশ্বের আর কোন দেশের রাজধানীর রাস্তা-ঘাট বৃষ্টির পানিতে ঘন্টার পর ঘন্টা এভাবে তলিয়ে থাকে কিনা আমাদের জানা নেই। বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের শহর ঢাকার এ দুর্দশা যুগের পর যুগ ধরে চলছে। এ থেকে পরিত্রাণের কোন আশা তারা দেখছেন না। এভাবেই তাদের বসবাস করতে হবে এবং চলতে হবে, এ যেন তাদের নিয়তি। দুই. দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মেগা সিটি ঢাকা। বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে একটি। প্রায় চারশ’ বর্গকিলোমিটারের এই শহরের লোকসংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় পঁচিশ হাজার মানুষের বসবাস। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার মানুষ এ শহরে প্রবেশ করছে। ঢাকামুখী মানুষের স্রোত প্রতিদিনই বাড়ছে। ঠেকানোরও উপায় নেই। সবারই ধারণা, একবার ঢাকায় যেতে পারলে জীবন বদলে যাবে। তাদের এই মনোভাব রাজধানীর সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সারা দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গড় হার যেখানে দেড় শতাংশ, সেখানে ঢাকায় সাড়ে পাঁচ শতাংশ এবং তা ক্রমেই বাড়ছে। বলা হচ্ছে, আগামী দুয়েক-বছরের মধ্যে ঢাকা হবে বিশ্বের তৃতীয় জনবহুল শহর। নাইজেরিয়ার লাগোসের পর জনসংখ্যা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ঢাকা দ্বিতীয়। যতই দিন যাবে, জনসংখ্যার বৃদ্ধির সাথে সাথে ঢাকার পরিস্থিতি যেমন করুণ হবে, তেমনি সুযোগ-সুবিধাও অপ্রতুল হয়ে উঠবে। এমনিতেই মেগা সিটির যে বৈশিষ্ট্য এবং সুযোগ-সুবিধা থাকে, তার অনেক কিছুই ঢাকায় নেই। এর আমেজ কেমন হয়, এ অভিজ্ঞতা নগরবাসীর কোনদিনই হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে হবে কিনা সন্দেহ। নগরবিদরা মনে করছেন, মেগা সিটি যেভাবে পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠে, ঢাকা সেভাবে গড়ে উঠেনি এবং উঠছেও না। বলা বাহুল্য, একটি দেশের রাজধানী তার সভ্যতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। চেহারায় যেমন মানুষের মনের ভাব প্রতিফলিত হয়, তেমনি রাজধানীর চিত্রের মাধ্যমে দেশের সার্বিক পরিস্থিতির চিত্র পাওয়া যায়। প্রখ্যাত আইরিশ ঔপন্যাসিক ও কবি জেমস জয়েস তার প্রিয় শহর ডাবলিনকে নিয়ে বলেছেন, ‘আমি যদি ডাবলিনের হৃদয় স্পর্শ করতে না পারি, তবে বিশ্বের আর কোন শহরের হৃদয় স্পর্শ করতে পারব না।’ প্রবাস জীবনে থেকেও ডাবলিনের প্রতি তার এই আকুতি ঝরে পড়েছিল। প্রিয় শহর ঢাকা নিয়ে এর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তা ব্যক্তিদের মধ্যে এমন তাড়না যে নেই, তা ঢাকার দুর্দশা দেখেই বোঝা যায়। নগরবিদরা ঢাকাকে এখন সভ্য নগর হিসেবে মনে করেন না। ময়লা আবর্জনা ও ইট-পাথরের ডাম্পিং শহর হিসেবে বিবেচনা করেন। শুধু নগরবিদরা নন, বিশ্বের খ্যাতিমান জরিপ সংস্থা যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জরিপে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে বসবাস অনুপযোগী ও অযোগ্য শহর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সংস্থাটির জরিপে বেশ কয়েকবার বিশ্বের বসবাস অনুপযোগী ও অসভ্য নগরীর তালিকায় ঠাঁই পায়। ইকোনমিস্টের জরিপের সূচক তৈরি করা হয় ৩০টি মানদন্ডের ভিত্তিতে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা, অপরাধ সংঘটনের হার, স্বাস্থ্যসুবিধা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং অবকাঠামো। ১০০ নম্বরের মধ্যে ঢাকা পেয়েছিল ৩৮, অর্থাৎ ফেল। ঢাকা চিহ্নিত হয় অসভ্য বা বসবাস অনুপযোগী নগরী হিসেবে। এই অসভ্য নগরীতেই আবার জমির দাম ও বাড়িভাড়া পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি। এখানে এক শতাংশ জায়গার দাম গড়ে ২ কোটি টাকা এবং প্রতি বর্গফুট আবাসিক বাসাভাড়া ২০ থেকে ২৫ টাকা। যানজটে প্রতি বছর ক্ষতি হয় প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ শতাংশ। এ নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কোন মাথাব্যথা আছে বলে প্রতিয়মান হচ্ছে না। সংকট উত্তরণে কার্যকর ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেয়ার আশানুরূপ তৎপরতা দেখা যায় না। এমনকি বিদ্যমান সুবিধাটুকুও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ধরে রাখতে পারছে না। ফলে অসভ্য নগরী হিসেবে চিহ্নিত ঢাকা আরও অসভ্যতার পথেই হাঁটছে। তিন. রাজধানীর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণ এমন যে, বছরের পর বছর নগরবাসীকে সীমাহীন দুর্ভোগে রাখতে পারলেই যেন তাদের শান্তি। নগরবাসীকে তারা নাগরিক হিসেবেই মনে করে না। অথচ নগরবাসী ট্যাক্স দিচ্ছে এবং এই ট্যাক্সের পয়সাই সংস্থাগুলো পরিচালিত হচ্ছে। বিনিময়ে তারা ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না। তাদের জীবন অতিষ্ঠ করার যতরকম সমস্যা আছে, তার সবকিছুই জিইয়ে রেখেছে। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য ও পরিতাপের বিষয় আর কিছু হতে পারে না। বিগত ৪০ বছরেও পানিবদ্ধতা নিরসনে ওয়াসা একটি আধুনিক ড্রেনেজ সিস্টেম গড়ে তুলতে পারেনি। পঞ্চাশ-ষাটের দশকের ঢাকা উপযোগী যে ড্রেনেজ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, তার উপর নির্ভর করেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা ওয়াসার বিপনন ও ব্যবস্থাপনা শাখার একজন নির্বাহী প্রকৌশলী বলেছেন, ঘন্টায় ২০ মিলিমিটার বৃষ্টি হবে বিবেচনায় নিয়ে ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা করা হয়। এর চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হলেই পানিবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। কিছু এলাকায় সিটি কর্পোরেশনের ১২০০ মিলিমিটার ব্যাসের পাইপ লাইন রয়েছে। ওয়াসার পাইপ লাইন ৯০০ মিলিমিটারের। ফলে সিটি কর্পোরেশনের পাইপ থেকে প্রবাহিত পানি ওয়াসার পাইপ লাইন ধারণ করতে পারে না। এতে অনেক জায়গায় পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। তার এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা কতটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ বছরের পর বছর চলে গেলেও ওয়াসা এ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে পারছে না। পরিকল্পিত ড্রেনেজ সিস্টেম গড়ে তুলতে পারছে না। আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে বৃষ্টির হার যে প্রতি বছর বাড়ছে বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না। গত সপ্তাহে ৬২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়াবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছেন ভবিষ্যতে বৃষ্টির হার আরও বাড়বে। তখন পানিবদ্ধতায় ঢাকা শহর অচল হয়ে পড়বে। এখনই সামান্য বৃষ্টিতে নগরীর অধিকাংশ রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির পানি ও ড্রেনের পানি একাকার হয়ে অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যেই সংস্কারের নামে চলছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি। প্রতিনিয়ত চরম দুর্ভোগে পড়েছে নগরবাসী। পানিবদ্ধতার কারণে গর্তে পড়ে অনেক মানুষ যেমন আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন, তেমনি তলিয়ে থাকা বিদ্যুতের ছেঁড়া তারে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। এর দায় কেউ নিচ্ছে না। বৃষ্টির মৌসুমে নির্বিচারে রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে মূল সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির মহোৎসব কেন শুরু হয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কেন এ সময়ে অনুমতি দেয়, এ নিয়ে নগরবাসীর প্রশ্ন ও ক্ষোভ দীর্ঘ দিনের। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যে নগরবাসীর এ ক্ষোভের কোন তোয়াক্কা বা ভ্রুক্ষেপ করে না, বর্ষা মৌসুমে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির সংস্কৃতি বন্ধ না হওয়া থেকেই বোঝা যায়। নগরবাসীর এই ভোগান্তি কবে শেষ হবে, এ নিয়ে সিটি কর্পোরেশন ও ওয়াসা, এমনকি সরকারের পক্ষ থেকেও কখনো কোন নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। কেউই নগরবাসীর চিরন্তন এই সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছে না। সিটি কর্পোরেশন দুই ভাগ করেও কোন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ একটু তৎপর ও সচেতন হলেই পানিবদ্ধতার সমস্যা নিরসন সম্ভব। সিডিউল পরিবর্তন করে শুষ্ক মৌসুমে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলে অনেকাংশে ভোগান্তির অবসান হয়। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই সিদ্ধান্ত নেয়ায় জনসাধারণের ভোগান্তি অনেকটাই লাঘব হয়েছিল। কঠোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তখন বর্ষা মৌসুমে সব ধরনের রাস্তা খোঁড়ার কাজ বন্ধ করা হয়। ফলে নগরবাসীকে খুব বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি। অর্থাৎ সদিচ্ছা থাকলে কোন কিছুই অসম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে এ ধারা অব্যাহত থাকেনি। বর্ষা মৌসুমের কিছু দিন আগে থেকেই রাস্তা খোঁড়া সংস্কৃতি ফিরে আসে। জনসাধারণের ভোগান্তিও শুরু হয়। বিষয়টি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন জনসাধারণকে ভোগান্তিতে ফেলে আনন্দ পান। তাদের আনন্দিত হওয়ার অন্তর্নিহিত কারণ যে আছে, তাতে সন্দেহ নেই। বর্ষায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি হলে বৃষ্টির অজুহাতে কাজ বিলম্বিত হয়, কাজ বিলম্বিত হলে পুনরায় অর্থ বরাদ্ধ হবে এবং তা থেকে ঠিকাদারের যেমন লাভ, তেমনি সংশ্লিষ্ট অসৎ কর্মকর্তাদেরও কমিশন প্রাপ্তির লাভ রয়েছে। অর্থাৎ দুর্নীতির ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্যই বর্ষায় রাস্তা খোঁড়ার সংস্কৃতি শুরু হয়। ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সমস্যা সৃষ্টি এবং বিশ্বে রাজধানীর বদনাম হওয়ার মতো এমন কর্মকান্ড হয় কিনা আমাদের জানা নেই। এ সংস্কৃতি বন্ধ না হলে কোন দিনই নগরবাসীর ভোগান্তির অবসান হবে না। বৃষ্টিতে রাজধানীর আশপাশের শহরতলী এলাকাগুলোর অবস্থা শোচনীয় হওয়া নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে ডিএনডি বাঁধের ভেতরের এলাকাগুলো সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়া এবং সেখানে বসবাসকারী মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কথা প্রতি বছরই উঠে আসে। বর্ষা ও বৃষ্টি এ এলাকার মানুষের কাছে অভিশাপ হয়ে আসে। এ বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। একদিনের বৃষ্টিতেই এলাকার কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। তাদের দুর্দশার অন্ত থাকে না। ষাটের দশকে নারায়ণগঞ্জের দুইটি ইউনিয়নসহ ঢাকা ও শহরতলীর ৮ হাজার ৩৪০ হেক্টর জমিতে সেচের জন্য ডিএনডি বাঁধ প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। সেখানে ১০০ কিলোমিটার খালও খনন করা হয়। কালক্রমে অবৈধ দখলের কারণে প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম প্রায় সব খাল ভরাট হয়ে গেছে। এতে জমে থাকা পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে না। ৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ডিএনডি বাঁধের ভেতরের পানি সরাতে প্রতি সেকেন্ডে ১২৮ কিউসেক পানি নিষ্কাশন ক্ষমতার ৪টি এবং ৫ কিউসেক ক্ষমতার ২৫টিসহ রয়েছে ৩০টি পাম্প। এসব পাম্প দিয়ে পুরোপুরি পানি নিষ্কাশন সম্ভব নয়। ফলে বাঁধের ভেতর বসবাসকারীদের বৃষ্টি ও বর্ষায় পানিবদ্ধ অবস্থায় থাকতে হয়। শহরতলী মূল শহরের বাইরে হলেও দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে এগুলো শহরের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছে। এসব এলাকার সমস্যা ও ড্রেনেজ সিস্টেম মূল নগরীর সাথে যুক্ত হওয়ায় এর প্রভাব রাজধানীতে পড়ছে। রাজধানীর ড্রেনেজ সিস্টেম সঠিকভাবে গড়ে না ওঠায়, শহরতলীর ড্রেনেজ সিস্টেমের সাথে যুক্ত হয়ে পানিবদ্ধতাকে আরও জটিল করে তুলছে। এ কথা অনস্বীকার্য, আশপাশের এলাকা ড্রেনেজ সিস্টেমের উন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি না করলে মূল শহরের সুযোগ-সুবিধারও ব্যঘাত ঘটে। রাজধানী ঘিরে যেসব নদী রয়েছে, রাজধানীকে সজীব ও পানিবদ্ধতামুক্ত রাখতে এগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবৈধ দখলের কারণে রাজধানীর ধমনী হিসেবে পরিচিত নদীগুলোর স্বাভাবিক গতিধারা হারানোর পাশাপাশি এগুলোর অস্তিত্ব বিলীন হতে চলেছে। ফলে শহর থেকে প্রতিদিন যে বর্জ্য ও দূষিত পানি নিঃসরিত হয়, তা নদীতে গিয়ে পড়ছে এবং সেখানেই স্থির থেকে যাচ্ছে। স্বাভাবিক গতি না থাকায় নদীগুলো বাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বুড়িগঙ্গা এখন ঢাকার অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পানি এতটাই কালো ও বিষাক্ত যে, এতে কোন প্রাণের অস্তিত্ব নেই। অথচ আগে বিদেশি কোন রাষ্ট্রীয় অতিথি এলে এই বুড়িগঙ্গায়ই নৌ-বিহারে নিয়ে যাওয়া হতো। এটি ছিল আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন ভুলেও কোন রাষ্ট্রীয় অতিথিকে নৌ-বিহারে নিয়ে যাওয়া হয় না। রাজধানীর এ অবস্থার জন্য বিশ্লেষকরা মূলত রাজনীতিকদের দায়ী করেন। তারা মন্তব্য করেন, ‘রাজনীতিকদের কারণেই অপরিকল্পিতভাবে ঢাকা মহানগরী গড়ে উঠেছে। রাজনীতির কারণেই ঢাকা কেন্দ্রীভূত বা অতি কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এখন পর্যন্ত দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি ঢাকামুখী। আগামীতে কি পরিণতি হবে তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে। তারা বলেন, ঢাকার স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সবচেয়ে খারাপ বলেই এই দুরবস্থা। চার. ঢাকা শহর সভ্য না হওয়ার অন্যতম কারণ সুষম পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের অভাব। যেভাবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ হচ্ছে, এ ধারা অব্যাহত থাকলে ঢাকা কখনোই বাসযোগ্য শহরে পরিণত হতে পারবে না। নগরবিদরা মনে করছেন, ঢাকা শহরের জন্য আর্থিক সামর্থ্য বড় ব্যাপার নয়, সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কার্যকর করাই প্রধান সমস্যা। ঢাকাকে বাসযোগ্য করে তুলতে হলে, প্রত্যেকটি সমস্যা আলাদাভাবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সমাধানে উদ্যোগ নেয়া জরুরী। যানজটের কারণে যে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়, তা নিরসন করতে পারলে এই অর্থ দিয়েই অন্যান্য সমস্যা সমাধান সম্ভব। বৃষ্টি মৌসুমে পানিবদ্ধতা যেহেতু নগরবাসীর জন্য চরম সমস্যা হয়ে দেখা দেয়, এই সমস্যা নিরসনে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। বিদ্যমান ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখা এবং সংস্কার কাজ বর্ষায় না করে শুষ্ক মৌসুমে করা বাঞ্চনীয়। রাজধানীতে এক সময় অসংখ্য প্রাকৃতিক খাল ছিল। খালগুলো বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন এবং শহরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। অবৈধ দখলের কারণে এসব খাল এখন আর নেই। দখলমুক্ত করে কিছু খাল উদ্ধার ও সংস্কার করতে পারলে পানিবদ্ধতা অনেকটাই কমে যেত। পাম্প বসিয়ে পানি নিষ্কাশন কোন স্থায়ী সমাধান নয়। পানিবদ্ধতা নিরসন করতে হলে ড্রেনেজ সিস্টেম উন্নত করতে হবে। সিটি কর্পোরেশন ও ওয়াসার সমন্বয়ে ড্রেনের পাইপ বসিয়ে স্থায়ীভাবে সমস্যা সমাধান করতে হবে। তা না হলে প্রতি বছরই বার বার রাস্তা খুঁড়তে হবে, অর্থের অপচয় হবে এবং জনভোগান্তিরও সৃষ্টি হবে। ঢাকাকে বাসযোগ্য ও পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মেয়াদের মহাপরিকল্পনা নেয়া এবং দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরী। darpan.journalist@gmail.com